বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং কার্যক্রমে গতি আনতে সাংগঠনিক পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে সংগঠনটিকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় সংসদের পক্ষ থেকে একের পর এক নতুন কমিটি ঘোষণা করা হচ্ছে।
নতুন কমিটি ঘোষণা
ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাছির সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট, জেলা, মহানগর এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। গত কয়েকদিনে ৪৫টিরও বেশি ইউনিটে পূর্ণাঙ্গ ও আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
জানা গেছে, ঢাকা মহানগর উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম (পূর্ণাঙ্গ কমিটি), ময়মনসিংহ মহানগর, ময়মনসিংহ উত্তর ও দক্ষিণ জেলা, জামালপুর জেলা ও মহানগর, নেত্রকোনা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, খাগড়াছড়ি, মানিকগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, রাঙ্গামাটি, কুমিল্লা মহানগর এবং নোয়াখালী জেলা শাখার কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদলের সক্রিয়তা বাড়াতে বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়েও নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স), রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় এবং পুণ্ড্র ইউনিভার্সিটি। ময়মনসিংহ, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর মেডিকেল কলেজেও আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা কলেজসহ ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ, জয়পুরহাট সরকারি কলেজ, নারায়ণগঞ্জ কলেজ এবং হাজী মিছির আলী ডিগ্রি কলেজেও নতুন কমিটি দেওয়া হয়েছে।
অনুমোদন প্রক্রিয়া
ছাত্রদল সূত্রে জানা গেছে, ঘোষিত এসব কমিটি চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জমা দেন সংগঠনটির শীর্ষ দুই নেতা। এরপর তিনি চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার পরই ধাপে ধাপে এসব কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়।
সূত্র আরও জানায়, ঘোষিত কমিটির বাইরে আরও বেশ কিছু জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের কমিটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব কমিটিও ইতোমধ্যে বিএনপির চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেওয়া রয়েছে।
সংগঠনটির নেতারা বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সংগঠনকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করতে তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্বকে সামনে আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই একসঙ্গে সব কমিটি প্রকাশ না করে ধাপে ধাপে অনুমোদন ও প্রকাশের কৌশল নেওয়া হয়েছে। অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে বাকি কমিটিগুলোও শিগগির ঘোষণা করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, “আমরা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছি। তৃণমূল পর্যায়ে যোগ্য, সক্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের কাজ চলছে। যেসব কমিটি ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে, সেগুলো যাচাই–বাছাই শেষে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “অবশিষ্ট কমিটিগুলোও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যথাসময়ে এগুলো ঘোষণা করা হবে। সংগঠনকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য।”
বিক্ষোভ ও অসন্তোষ
এদিকে, ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটে নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দেশের একাধিক স্থানে চরম উত্তেজনা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কমিটি ঘোষণার পরপরই নোয়াখালী, রাঙামাটি, বরিশাল, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় পদবঞ্চিত ও অসন্তুষ্ট নেতাকর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন।
নোয়াখালীতে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। একই সময়ে রাঙামাটিতে ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করতে বাধ্য হয়।
বরিশালে কমিটিতে ‘অযাচিত অনুপ্রবেশ’ ও ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। বান্দরবানে বিবাহিতদের পদায়নের প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। কিশোরগঞ্জেও পদবঞ্চিতদের বিক্ষোভ ও ক্ষোভ প্রকাশের খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের বাদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ‘পকেট কমিটি’ করা হয়েছে। তাদের দাবি, কিছু জায়গায় অছাত্র, বিবাহিত এমনকি বিতর্কিত রাজনৈতিক অতীত রয়েছে—এমন ব্যক্তিদেরও গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল জেলা ছাত্রদল নেতা রেদওয়ান খান রাকিব বলেন, “আমরা দলের দুঃসময়ে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছি, অথচ ষড়যন্ত্র করে আমাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানের বাংলাদেশ গড়তে হলে আগে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে হবে।”
নোয়াখালী জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন রকি অভিযোগ করে বলেন, “নোয়াখালীতে ‘পকেট কমিটি’ গঠন করেছেন। রাজপথের সক্রিয় কর্মীদের বাদ দিয়ে বিবাহিত ও অছাত্রদের কমিটিতে বড় পদ দেওয়া হয়েছে।”
তবে নোয়াখালী জেলা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সভাপতি এন.বি.এস রাসেল বলেন, “আমি ও সাধারণ সম্পাদক উভয়ই মাস্টার্সের ছাত্র। রাজনৈতিক প্রোফাইল দেখেই কেন্দ্র আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে, যারা আন্দোলন করছে তাদের অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।”
তবে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক প্রয়োজন, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, কর্মীদের দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা এবং নেতৃত্বের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, সব ইউনিটে ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর নেতৃত্ব নিশ্চিত করতেই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স বলেন, “ছাত্রদল একটি বৃহৎ সংগঠন। এখানে মতপার্থক্য বা কিছুটা অসন্তোষ থাকতেই পারে, কিন্তু আমরা সবাই একই লক্ষ্য ও আদর্শে বিশ্বাস করি। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে যেন ত্যাগী, সক্রিয় এবং যোগ্য নেতাকর্মীরা মূল্যায়ন পান।”
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ রাখা। তাই সবাইকে ধৈর্য ধরে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সংগঠনের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।”



