ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা: বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নপ্রাপ্ত তরুণী চিকিৎসক
অবশেষে বহুল আলোচিত ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি থেকে আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন লাভ করেছেন। সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে দলের কেন্দ্রীয় ঘোষণার মাধ্যমে তার এই মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়। শেরপুরের এই তরুণী চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদের মনোনয়ন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার সূত্রপাত করেছে।
নির্বাচনী ইতিহাস ও বিতর্ক
এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রিয়াঙ্কা বিএনপির মনোনীত ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে শেরপুর-১ (সদর) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেই নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন। তবে নির্বাচনকে ঘিরে তিনি জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির গুরুতর অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনে লিখিত আবেদন করেন।
পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে তথ্য-উপাত্তসহ প্রেস ব্রিফিং করে বিষয়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেন। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দেওয়ার পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে প্রিয়াঙ্কা দাবি করেন যে, শেরপুরে রিটার্নিং অফিসার তার বিজয়কে ছিনিয়ে নিয়ে জামায়াতের প্রার্থীকে বিজয়ী করেছেন।
২০১৮ সালের নির্বাচন ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা
এর আগে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন প্রিয়াঙ্কা। সেই সময় তৎকালীন সরকার ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে তার গাড়িবহরে হামলা, নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ এবং মিথ্যা মামলার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল।
অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের কোনো পদক্ষেপ না থাকায় তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। এই ঘটনা তাকে জাতীয় রাজনীতিতে একটি আলাদা পরিচয় এনে দিয়েছিল।
নিরবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি শেরপুরের শহর, বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, শ্রমিকের কর্মস্থল ও কৃষকের মাঠে নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়েছেন। নির্বাচনে পরাজিত হলেও তিনি থেমে থাকেননি। সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন পেতে ঢাকায় দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিলেন।
এই ধারাবাহিকতায় তিনি এবার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। পেশায় চিকিৎসক এই তরুণী কেবল শেরপুরেই নয়, সারা দেশের বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক পটভূমি
ডা. প্রিয়াঙ্কা শেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হযরত আলী এবং নিলুফা দম্পতির কন্যা। তার স্বামী রাহেমীন চৌধুরী পেশায় একজন আইনজীবী। ২০১৮ সালে হযরত আলী কারাবন্দি থাকায় তার পরিবর্তে প্রিয়াঙ্কাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ২০২৬ সালের নির্বাচনে আবারও তিনি দলীয় মনোনয়ন লাভ করেছেন।
শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত জীবন
উচ্চশিক্ষিত এই প্রার্থী এমবিবিএস পাশের পর লন্ডন থেকে এমআরসিএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি অনলাইন স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। তার এই দ্বৈত পরিচয় তাকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি নিয়ে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও আইনি অবস্থান
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডা. প্রিয়াঙ্কার নামে বর্তমানে কোনো মামলা নেই এবং তিনি কোনো ধরনের ব্যাংক ঋণেও জড়িত নন। কর প্রদানেও তিনি নিয়মিত রয়েছেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৩ টাকার রিটার্ন দাখিলের বিপরীতে তিনি ২৪ হাজার ৯১০ টাকা আয়কর প্রদান করেছেন।
ডা. প্রিয়াঙ্কার এই মনোনয়ন বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দলের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত বহন করছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মত প্রকাশ করেছেন। শেরপুরের এই চিকিৎসক-রাজনীতিবিদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা এখন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।



