জামায়াত আমিরের ‘সময় ফুরিয়ে আসছে’ মন্তব্যে রাজনীতিকদের ক্ষোভ
জামায়াত আমিরের মন্তব্যে রাজনীতিকদের ক্ষোভ

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ ৪ মাস না পেরোতেই ‘সময় ফুরিয়ে আসছে’ বলে সরকারকে হুঁশিয়ার দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, ‘‘সরকার গণভোটের রায় বা জনদাবি স্বেচ্ছায় মেনে না নিলে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।’’

রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া

জামায়াত আমিরের এমন বক্তব্যকে ‘অবিবেচক’ এবং ‘গুরুত্বহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাজনীতিবিদরা। তাদের মতে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা একটা দলের ৪ মাস না পেরোতেই ‘সময় ফুরিয়ে আসছে’ বলাটা রাজনৈতিক অজ্ঞতা। জামায়াত আমিরের এমন বক্তব্যের কারণে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এই সরকারের ভুল-ত্রুটি দিয়ে কোনোভাবেই স্বৈরাচারী সরকারের শাসনামল জাস্টিফাই করার সুযোগ নেই।

সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদকের মন্তব্য

জামায়াত আমিরের বক্তব্যকে অদায়িত্বশীল ও অবিবেচক বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য যে সংসদে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটা দল বিরোধীদল হিসেবে আছে। তাদের প্রধান কাজই হচ্ছে ‘রাজনৈতিক চরিত্র হনন’ করা। বিরোধী দলের কার্যকলাপ বা আচরণ কেমন হবে সেটাই তারা জানে না।’’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সিপিবি’র এই নেতা আরও বলেন, ‘‘জামায়াতের অদায়িত্বশীল আচরণ বারবার তাদের কথার মাঝে ফুটে উঠছে। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো—মিডিয়াও তাদের এই বিষয়গুলো ফলাও করে প্রচার করছে। সরকার যদি জামায়াতের এমন কথাবার্তায় বিচলিত হয়, তাহলে কিন্তু চলবে না। তাদের উচিত এমন বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দিয়ে সংকট উত্তরণে কাজ করা। এর কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে আদতে দেশের চাবিকাঠি ছিল জামায়াত-এনসিপির হাতে। তারা দেশ ও দেশের অর্থনীতিকে কঠিন সংকটে ফেলেছে।’’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিরোধী দলের প্রতি সরকারের কিছুটা আনুগত্যের কারণে রুহিন হোসেন প্রিন্স দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘একবার সিদ্ধান্ত হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু জামায়াতের বিরোধিতার কারণে মন্ত্রী পরিষদ পরবর্তীকালে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। এমন বেশ কিছু বিষয় আছে, যা জামায়াতের বিরোধিতার মুখে সরকার করতে পারেনি। অথচ বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতের কাজ হচ্ছে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করা, দেশের শিক্ষাঙ্গনের সাংস্কৃতিক পরিবেশ নষ্ট করা নয়।’’

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য

‘জামায়াত আমিরের বক্তব্যকে এক ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করতে সব কিছুতে বিরোধিতা করতে শুরু করেছে। তাদের দলনেতা সেই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে। তার বক্তব্যগুলো কেবল রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। কেননা, ৪ মাসের একটি সরকারকে ৯৬-এর পরিণতি ভোগ করতে হবে, এ ধরনের বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য।’’

গণঅধিকার পরিষদের নেতার মন্তব্য

জামায়াতের রাজনীতিকে অপরাজনীতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদের সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ। তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত আসলে একটা গুজবনির্ভর দল। তাদের রাজনৈতিক কোনও ভিত্তি নেই। অপরাজনীতি আর গুজবের মাধ্যমে তারা বরং রাজনীতিটাকে দূষিত করে তুলেছে। নির্বাচনের আগে তারা মনে করতো ক্ষমতায় আসবে। জামায়াত ক্ষমতায় আসতো যদি ফেসবুকে নির্বাচন হতো।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘একটা দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের চার মাস না যেতেই যখন বলা হয়—তাদের সময় ফুরিয়ে এসেছে, তাহলে বুঝতে হবে তাদের (জামায়াতের) রাজনৈতিক দূরদর্শিতা কতটুকু। আমার বিশ্বাস, জামায়াত আমির এই কথাটি ভুল করে বলেছেন। তাছাড়া জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা যখন একজন শিবির নেতার ধর্ষণ ও নিজে নিজে আত্মগোপনের বিষয়টি গুম বলে প্রচার করলো, জামায়াত আমির সেটাও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন। এ থেকেই বোঝা যায়, তারা আসলে কীভাবে রাজনীতি করছে।’’

জামায়াতের বক্তব্য

জামায়াত জনবিচ্ছিন্ন নয়, বরং জামায়াতের জনসম্পৃক্ততা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করছে। আমাদের লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করা। এর মধ্য দিয়ে আমাদের জনসম্পৃক্ততা বাড়ছে। বরং সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের অপকর্মের কারণে তারা ধীরে ধীরে জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছে।’’

জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ‘সরকারের সময় ফুরিয়ে এসেছে’ জামায়াত আমির এ কথা বলেননি। তিনি সরকারকে গণভোটের রায় স্বেচ্ছায় মেনে নিতে বলেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াত আমির বলেছেন, ‘সময় খুবই সীমিত। সময় ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ের মধ্যে পরিবর্তন না হলে পরিণতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে।’ আমরাও স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সরকার গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তা মোকাবিলা করবো।

বিএনপি নেতাদের প্রতিক্রিয়া

বিরোধীদলীয় নেতার এমন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ‘শকুনের দোয়ায় গরু মরে না’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন নবী খান সোহেল। তিনি বলেন, ‘‘আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছি। জনগণ যতদিন এই সরকারকে ক্ষমতায় রাখবে, আমরা ততদিন থাকবো। শকুনের দোয়ায় গরু মরে না। আমরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানাই। কোনও অপশক্তি যদি দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করে, তাহলে জনগণই তাদের প্রতিহত করবে।’’

তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘পতিত স্বৈরাচার এবং রাজাকাররা মিলে যদি জনবিরোধী কোনও কার্যকলাপ করে এবং দেশ ও দেশের মানুষকে বিপদে ফেলার পাঁয়তারা করে, তাহলে তাদের পরিণতিও একাত্তরের মতো হবে।’’

জামায়াতের কর্মকাণ্ডকে আগাগোড়া ভাঁওতাবাজি বলে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জামায়াতের নেতাকর্মীদের কথাবার্তার কোনও লাগাম নেই। তারা মনে যা আসে তাই বলে। এরা রাজনীতিটাকে দূষিত করে ফেলেছে। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা থেকে শুরু করে এরা এখন সব ভালো কিছুর বিরোধিতায় প্রথম সারিতে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘জামায়াত ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করে। দেশের সব অপকর্মের সঙ্গে তারা জড়িত, কিন্তু দায় চাপিয়ে দেয় বিএনপি সরকারের ওপরে।’’ যেহেতু তারা এখন বিরোধী দল হিসেবে সংসদে আছে, সেই কারণে হলেও তাদের নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান তিনি।