ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা গতকাল রোববার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানিয়েছেন, তাঁরা ভারতের জাতীয়তাবাদী নাগরিক দলের (এনসিপিআই) সঙ্গে একীভূত হয়েছেন। তাঁরা এখন লোকসভায় আলাদা দল হিসেবে বসতে চান। এর মাধ্যমেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে এমন একটি স্বল্প পরিচিত দল, যারা ২০২৩ সালে ত্রিপুরার বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়েছিল। তারা যে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, দুটিতেই জামানত হারিয়েছিল।
এনসিপিআইয়ের পরিচিতি
এনসিপিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা শিউলি কুণ্ডুর নেতৃত্বে দলটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আসাম ও ত্রিপুরায় সক্রিয় রয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুসারে, এনসিপিআই একটি ‘নিবন্ধিত’ দল, যার নির্বাচনী প্রতীক হলো ‘সাতটি রশ্মিসহ কলমের নিব’। উনকোটি জেলার কৈলাশহর বিধানসভা আসন থেকে জাহাঙ্গীর আলী (৫৪) এবং ধলাই জেলার চাওমনু বিধানসভা আসন থেকে বারজেদা ত্রিপুরা (৬৫) এনসিপিআইয়ের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বাকি দুই প্রার্থীর পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সূত্র জানায়, সম্ভবত ওই দুজন দল–সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন।
নির্বাচনী ফলাফল
ফলাফলের দিক থেকে দলটি যে দুটি আসনে নিজস্ব প্রার্থী দিয়েছিল, সেখানে সম্মিলিতভাবে মাত্র ৮২২ ভোট পেয়েছে। এর মধ্যে তফসিলি উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত চাওমনু আসনে ৫৩৬ এবং কৈলাশহরে ২৮৬ ভোট পেয়েছেন দলীয় প্রার্থীরা।
কাকতালীয়ভাবে, তৃণমূল কংগ্রেস কৈলাশহরে তৃতীয় স্থানে ছিল, যদিও তারা পেয়েছিল মাত্র ৬৯৬ ভোট, যা এনওটিএ ভোটের (৫৩৭) চেয়ে সামান্য বেশি। চাওমনুতে তারা ৫৬৬ ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে ছিল, যা আবার এনওটিএ ভোটের (৫০০) চেয়ে সামান্য বেশি ছিল।
অরুণাচলের উদাহরণ
তৃণমূলের বিদ্রোহী সংসদ সদস্যরা এনসিপিআইতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় ২০১৬ সালের অরুণাচল প্রদেশের একই রকম এক পরিস্থিতির স্মৃতিকে ফিরে আনছে। তখন কংগ্রেস সেখানে তাদের সরকার হারিয়েছিল। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নাবাম তুকি ছাড়া তাদের পুরো আইনসভা দলটি পিপলস পার্টি অব অরুণাচলে (পিপিএ) যোগ দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিজেপির নেতৃত্বাধীন উত্তর-পূর্ব ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনইডিএ) অংশ হয়েছিল তারা।
২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পেমা খাণ্ডু ও পিপিএর অন্য ৩২ বিধায়ক বিজেপির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন, যা গেরুয়া শিবিরকে উত্তর-পূর্বে প্রথম পূর্ণাঙ্গ সরকার উপহার দেয়। এই পদক্ষেপের পর ৬০ সদস্যের বিধানসভায় বিজেপির শক্তি ৪৫ জনে দাঁড়ায়। পিপিএর সদস্যসংখ্যা কমে ১০–এ দাঁড়ায় এবং কংগ্রেসের হাতে থাকে মাত্র তিনজন সদস্য। পরে ২০১৯ সালের নির্বাচনে পেমা খাণ্ডু বিজেপির হয়ে বিজয়ী হন এবং ৬০টি আসনের মধ্যে ৪১টি আসনে জয়ী হন।
কৌশলগত একীভূতকরণ
আসলে বিদ্রোহীদের এনসিপিআইয়ের সঙ্গে একীভূত হওয়ার সিদ্ধান্তটি দলত্যাগবিরোধী আইনের হাত থেকে বাঁচা এবং নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করতে সময় নেওয়ার একটি কৌশল বলে মনে হচ্ছে।
দশম তফসিলের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দল একীভূত করার ক্ষেত্রে দলত্যাগের কারণে বরখাস্তের নিয়মটি প্রযোজ্য হয় না। একই আইনসভার কোনো সদস্যের মূল রাজনৈতিক দলের একীভূতকরণ তখনই বৈধ বলে গণ্য হবে। ‘যদি’ এবং ‘কেবল’ সংশ্লিষ্ট আইনসভা দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য এ ধরনের একীভূতকরণে সম্মত হন।
গতকাল রোববার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে বৈঠকের পর ২০ জন বিদ্রোহীর অন্যতম প্রবীণ তৃণমূলদলীয় সংসদ সদস্য সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা এনসিপিআইয়ের সঙ্গে একীভূত হয়েছি। এটি একটি রাজনৈতিক দল। এটি একটি স্বীকৃত আঞ্চলিক দল। আপনি যখন দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য নিয়ে দল ছাড়বেন, তখন আপনি প্রথম দিনেই সেই দলের নাম দাবি করতে পারেন না। জুলাই মাসে যখন সংসদ আবার শুরু হবে, তখন আমরা তৃণমূলের নাম দাবি করব। কারণ, আমাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এরপর আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন, কোনটি আসল তৃণমূল।’
তৃণমূলের আইনগত অবস্থান
তবে তৃণমূলের নেতৃত্ব মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে ২০২৩ সালের সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চের একটি রায়কে তুলে ধরেছে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, একটি রাজনৈতিক দল ও আইনসভা দল দুটি আলাদা সত্তা এবং ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে সুরক্ষা পেতে হলে মূল রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততাসহ বৈধ একীভূতকরণ প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় গতকাল রোববার দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেছেন, মূল রাজনৈতিক দলটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
লোকসভায় তৃণমূল সংসদীয় দলের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ১০ জুন স্পিকার ওম বিড়লাকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, ‘৯১তম সংশোধনীর পর আইনপ্রণেতাদের কোনো গোষ্ঠীর আইনগতভাবে নতুন কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একমাত্র বৈধ পথ হলো দশম তফসিলের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীন একীভূতকরণ। যেখানে তাদের দুটি শর্ত পূরণ হতে হবে; অর্থাৎ রাজনৈতিক দলটিকেও একীভূত হতে হবে এবং একই সঙ্গে আইনসভা দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যকে দল পরিবর্তন করতে হবে।
বিদ্রোহীরা স্পিকারের সঙ্গে দেখা করার ঠিক আগমুহূর্তে চিঠিটি ওম বিড়লার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
অভিষেক লিখেছেন, ‘গণমাধ্যমে যেসব দাবির কথা আসছে, সেখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে মাত্র একটি শর্ত পূরণ করলেই চলবে—যা আসলে ভুল। অতএব কোনোভাবেই স্বীকার না করেও যদি ধরে নেওয়া হয়, আইনসভা দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য দল পরিবর্তন করেছেন, তবু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অন্য কোনো দলের একীভূতকরণ ঘটেনি বা এআইটিসি নামে কোনো নতুন দল গঠিত হয়নি।’
ডায়মন্ড হারবারের এই সংসদ সদস্য বলেন, রাজনৈতিক দলই সর্বেসর্বা, আইনসভা দল নয়। আদালত রায় দিয়েছেন, রাজনৈতিক দলই হাউসে দলের হুইপ এবং নেতা নিয়োগ করে, আইনসভা দল নয় এবং একটি নির্দিষ্ট উপায়ে ভোট দেওয়ার বা ভোটদানে বিরত থাকার নির্দেশ রাজনৈতিক দলই জারি করে, আইনসভা দল নয়। ফলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কোনো সদস্য মূল রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন করে নিজেদের নেতা বা হুইপ নিয়োগ করতে পারেন না বা আলাদা সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করতে পারেন না।’
স্পিকার ‘প্রতিদ্বন্দ্বী দল–উপদলকে নয়, বরং মূল রাজনৈতিক দলকে স্বীকৃতি দেন’ যুক্তি দেখিয়ে অভিষেক লিখেছেন, ‘আদালত রায় দিয়েছেন, যেখানে দুই বা ততোধিক উপদল নিজেদের মূল রাজনৈতিক দল বলে দাবি করে, সেখানে দশম তফসিলের ২(১) অনুচ্ছেদের অধীনে দলত্যাগ পিটিশনগুলোকে যাচাই করার ক্ষেত্রে স্পিকারকে প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে যে আসল রাজনৈতিক দল কোনটি। এই কাঠামো একটি আসল রাজনৈতিক দল খুঁজে বের করার কথা বলে, কোনো উপদলকে স্বাধীন স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলে না।’
অভিষেক আরও লিখেছেন, ‘যেকোনো স্বেচ্ছামূলক কাজ, যার মাধ্যমে কোনো সদস্য বা সদস্যরা নিজেদের একটি দল/উপদল হিসেবে জাহির করেন, দলের নেতা ও হুইপের কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন, অথবা রাজনৈতিক দলের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করেন—তা দশম তফসিলের ২(১)(এ) অনুচ্ছেদের অধীনে রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ স্বেচ্ছায় ত্যাগ করা হিসেবে গণ্য হবে এবং বরখাস্তের আওতায় আসবে। এ ছাড়া দলের হুইপের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া বা ভোটদানে বিরত থাকার ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ২(১)(বি) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অভিষেক স্পিকারের কাছে অনুরোধ জানান, তিনি যেন ‘এআইটিসি’-কে একটি একক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিবেচনা করেন, যা হাউসে কেবল তার যথাযথভাবে অনুমোদিত নেতা এবং হুইপের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করে। একই সঙ্গে তিনি যেন এআইটিসির কোনো তথাকথিত পৃথক গোষ্ঠী বা উপদলকে কোনো স্বীকৃতি, মর্যাদা বা সুবিধা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। পাশাপাশি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কোনো আবেদনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এআইটিসি-কে শুনানির সুযোগ দেন।’



