তারেক রহমানের চার পথ: ব্রাউনিংয়ের 'প্যাট্রিয়ট' কবিতার মতো ট্র্যাজেডি এড়াতে হবে
তারেক রহমানের চার পথ: ব্রাউনিংয়ের কবিতা থেকে শিক্ষা

তারেক রহমানের সামনে চারটি পথ: ব্রাউনিংয়ের 'প্যাট্রিয়ট' কবিতার সতর্কবার্তা

আমাদের উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্য 'প্যাট্রিয়ট' কবিতাটি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের কালজয়ী সৃষ্টি। কবিতাটি শুরু হয় বিজয়ীর প্রত্যাবর্তনের দৃশ্য দিয়ে—পাঁচ বছর আগে যখন কবি নগরে ফিরেছিলেন, তখন গোটা শহর তাকে অভূতপূর্ব উল্লাসে বরণ করে নিয়েছিল। পথে গোলাপ বিছানো হয়েছিল, মানুষ ছাদে দাঁড়িয়ে ফুল ছুড়েছিল, গির্জার ঘণ্টা বেজেছিল তার সম্মানে। জনতার ভালোবাসা এতটাই প্রবল ছিল যে, বিশ্বের সমস্ত উচ্ছ্বাস যেন তার কাছে তুচ্ছ মনে হতো।

পাঁচ বছর পরের মর্মান্তিক পরিণতি

কবিতার শেষাংশে দেখা যায়, সময়ের স্রোতে সেই একই ব্যক্তিকে অপমানের পথে নিয়ে যাওয়া হয়। ফুলের জায়গায় আসে পাথর, উল্লাসের স্থান দখল করে বিদ্রুপ। ব্রাউনিং মানুষের ভালোবাসার ক্ষণস্থায়িত্ব ও জনপ্রিয়তার অনিশ্চয়তার কথা বলেন, মহানায়ক থেকে মহা-অভিযুক্ত হয়ে যাওয়ার ভঙ্গুর দূরত্বের কথা বলেন। আজ, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অভিষিক্ত হতে যাওয়ার মুহূর্তে তারেক রহমান ঠিক এমনই একটি চার রাস্তার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়েছেন।

চারটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পথ

পথ-১: সংস্কার ও পুনর্গঠনের পথ – এই পথে তিনি তার সাম্প্রতিক ভাষণের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করবেন। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে, আইন সবার জন্য সমান হবে। ইশতেহারের কথা কেবল কথার কথা হবে না। উসকানির বদলে সংযম, প্রতিশোধের বদলে পুনর্নির্মাণ—তার এই ভাষ্য বাস্তবরূপ পাবে। তিনি স্টেটসম্যান হিসেবে দূরদর্শী, অভিজ্ঞ, সততা ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন রাষ্ট্রনেতা হয়ে উঠবেন। এই পথ কঠিন, কারণ এতে নিজের ঘরকেও 'না' বলতে হয়। কিন্তু সফল হলে এটিই তাকে নতুন পরিচয় দেবে এবং ইতিহাসে তিনি অমরত্ব পাবেন।

পথ-২: পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাওয়ার পথ – ক্ষমতা হাতে এলে চারপাশে সুবিধাভোগীরা ভিড় করবে। প্রশংসা বাড়বে, সমালোচনা কমে যাবে। দল ও রাষ্ট্রের সীমারেখা ঝাপসা হতে শুরু করবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই পথই সবচেয়ে পরিচিত, ইতিহাস বারবার এই রাস্তায় হেঁটেছে।

পথ-৩: প্রতিশোধ ও মেরুকরণের পথ – দীর্ঘ নির্যাতন, মামলা, নির্বাসনের স্মৃতি থেকে যদি রাজনীতি চালিত হয়, তাহলে অগ্রাধিকার হয়ে উঠতে পারে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করা। এতে সমর্থকেরা উল্লাস পেতে পারে, কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে পড়বে।

পথ-৪: প্রত্যাশার ভারে থমকে যাওয়ার পথ – আরেকটি বিপদ হলো ভুল করার ভয়ে বড় সিদ্ধান্ত না নেওয়া। অতিরিক্ত সতর্কতা, বিলম্ব, অর্ধেক পদক্ষেপ—এতে কেউ খুব রাগ করবে না, কিন্তু বড় পরিবর্তনও আসবে না। নেতা টিকে থাকতে পারেন, কিন্তু ইতিহাস তৈরি হয় না।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিক্রমা ও পরিবর্তন

তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা অত্যন্ত জটিল। এখানে রাজপুত্রের প্রত্যাবর্তন আছে, কিন্তু সঙ্গে আছে অভিযোগ, বিতর্ক, তীব্র দহন, দীর্ঘ নির্বাসন, শারীরিক ভাঙন এবং রাজনৈতিক পুনর্জন্ম। গত দেড় মাসে তার ভাষণে একটি বড় পরিবর্তন লক্ষণীয়। তিনি এখন উসকানির মুখে শান্ত থাকতে, ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার, নাগরিককে দুর্বল রেখে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না—এমন বার্তা দিচ্ছেন। এমনকি তিনি অতীতের 'অনিচ্ছাকৃত' ভুলের জন্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বিরল দৃশ্য।

তার বক্তৃতাগুলিতে ক্রমাগত ফিরে আসে কয়েকটি শব্দ: নিরাপত্তা, পরিকল্পনা, অংশগ্রহণ, বিকেন্দ্রীকরণ, তরুণ, নারী, প্রবাসী, কৃষক। যেন তিনি জানেন, অতীতের ইমেজ ভাঙতে হলে ভবিষ্যতের ভাষা চাই। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কার্টুনিস্ট মেহেদি হকের আঁকা একটি ব্যঙ্গ কার্টুন শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, 'আমি গভীরভাবে আনন্দিত যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হয়েছে...'—এটি তার পরিণত বোধের একটি চমৎকার উদাহরণ।

ক্ষমতা ও ব্যক্তির দ্বন্দ্ব

এই মুহূর্তে তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ক্ষমতা কি তাকে বদলাবে, নাকি তিনি ক্ষমতার চরিত্র বদলাতে পারবেন? ইতিহাস বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয়টি অত্যন্ত কঠিন। কারণ, ক্ষমতা অতীত-স্মৃতি ঝাপসা করে দেয়, চারপাশে প্রশংসার দেওয়াল তৈরি হয়, সমালোচনা পৌঁছায় না, এবং ভুলগুলো ধীরে ধীরে যুক্তিতে পরিণত হয়।

তবে অন্য ছবিটিও আছে: লন্ডনে বসে দল ধরে রাখা, প্রবীণদের সঙ্গে সমন্বয়, কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা, মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর দেশে ফিরে প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে সংযমের আহ্বান, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার না করে পরিকল্পনার কথা বলা। তিনি ইশতেহারে দারুণ সব কথা উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু ইশতেহারকে বহুকাল ধরেই 'বলার জন্য বলা' বলে মনে করা হয়। তিনি যা যা বলেছেন, যদি সত্যিই তা মানেন, তাহলে তাকে ক্ষমতার স্বাভাবিক প্রলোভনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে প্রতিদিন, বহু ক্ষেত্রে নিজের দলের কর্মীদের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে হবে।

আশা ও সতর্কতা

আমরা চাই, তার 'আই হ্যাভ এ প্ল্যান' যেন কেবল বক্তৃতার অলংকার না থাকে। আমরা চাই, তার দুঃখপ্রকাশ যেন কৌশল না হয়ে অনুশোচনা হয়। আমরা চাই, তার নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি যেন দলীয় পরিচয়ে ভাগ না হয়। আমরা চাই, তিনি যেন মনে রাখেন—ব্রাউনিংয়ের কবিতায় নায়ক শেষ পর্যন্ত ঈশ্বরের বিচারের ওপর ভরসা করেছিল, কারণ মানুষের বিচারে সে হেরে গিয়েছিল।

তারেক রহমানের সামনে সুযোগ আছে ইতিহাসের মহানায়ক হওয়ার। সতেরো বছরের নির্বাসন যদি তাকে ধৈর্য শিখিয়ে থাকে, তাহলে সেই ধৈর্যই হবে তার শক্তি। যদি নির্যাতন তাকে ক্ষমতার নিষ্ঠুরতা শেখায়, তাহলে সেটিই হতে পারে তার মানবিক নীতি। নইলে রবার্ট ব্রাউনিংয়ের 'প্যাট্রিয়ট' কবিতাটি তার জন্যও সত্য হয়ে উঠতে পারে, যেখানে নির্মল 'পুষ্প'সম্ভার সময়ের ব্যবধানে পাথরে পরিণত হয়। আমরা চাই—এই গল্পের শেষটা যেন প্যাট্রিয়টের মতো মর্মান্তিক না হয়।