কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও বরিশালে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা থেমে নেই। গত দুই মাস ধরে নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় দলটির নেতাকর্মীরা নিয়মিত মিছিল-সমাবেশ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। এমনকি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেও প্রকাশ্যে সড়কে নেমে বিক্ষোভ করতে দেখা গেছে তাদের। দিনের আলোয় ব্যস্ত সড়কে কর্মসূচি পালনের ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে।
প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচি
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বরিশালে আওয়ামী লীগ প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচি পালন করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন সকালে নগরীর সদর রোডে বিবির পুকুর পাড়ে থাকা দলীয় কার্যালয়ের সামনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমনের প্রত্যাশা সংবলিত ব্যানার টানানো হয়। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব হোসেন খানের পক্ষ থেকে টানানো ওই ব্যানারে শেখ হাসিনার পাশাপাশি ছিল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ ও তার ছেলে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সিটি মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহর ছবি। আওয়ামী লীগের এভাবে সক্রিয় হওয়ার খবর গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তৎপর হয় পুলিশ। গ্রেফতার অভিযান চালানো হয় নগরের বিভিন্ন এলাকায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে। এতে খানিকটা হলেও দমে যান তারা। পরবর্তী কিছুদিন আর দেখা যায়নি কোনো কর্মকাণ্ড।
মার্চ থেকে পুনরায় সক্রিয়তা
সপ্তাহ দুয়েক এভাবে চুপচাপ থাকার পর মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে আবার মাঠে নামে আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে কারাগার থেকে মুক্তি ও আদালতে হাজির হয়ে জামিন পান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি অ্যাড. তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস, মহানগর কমিটির সহসভাপতি সাবেক এমপি জেবুন্নেসা আফরোজ, মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি জসিমউদ্দিন এবং প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন। পরে প্রকাশ্যে ইফতার পার্টি, ৭ মার্চ, শেখ মুজিবের জন্মদিন, ঈদ পুনর্মিলনী ও স্বাধীনতা দিবস পালন করেন দলের নেতাকর্মীরা। জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার বিল পাশ হওয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোডে দিনের আলোয় হয় ওই মিছিল।
প্রকাশ্যে শোডাউন ও ফেসবুক লাইভ
কাশিপুর এলাকায় প্রকাশ্যে শোডাউন আর শত শত মানুষের সামনে লোকজন নিয়ে রেস্তোরাঁয় বসে চা-নাস্তা খান সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লিটন মোল্লা। ফেসবুক লাইভে প্রচার করে এসব কর্মকাণ্ড করেন তিনি। জাতীয় দিবসগুলোর ক্ষেত্রে ওয়ার্ড পর্যায়ে পৃথক কর্মসূচি পালনের পর তার ভিডিও চিত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয় গণমাধ্যমগুলোর কার্যালয়ে। পরে যাচাই করে মেলে এসব কর্মসূচি পালিত হওয়ার সত্যতা।
ভারত থেকে পরিচালিত কর্মসূচি
কেবল কর্মসূচি পালনই নয়, বর্তমানে ভারতে আত্মগোপনে থাকা দলটির প্রভাবশালী কয়েকজন নেতা ঘুরে যান বরিশালে। মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল বরিশালে এসে তার বাড়িতে রেজিস্ট্রি কর্মকর্তাদের নিয়ে বিক্রীত জমির দলিল দিয়ে যান ক্রেতা পক্ষকে। এছাড়া নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে নিজের উপস্থিতির জানান দিয়ে যান মহানগর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক রইজ আহম্মেদ মান্না। তারা দুজনই সাদিক আব্দুল্লাহর একান্ত কাছের মানুষ হিসাবে পরিচিত। নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া খবরানুযায়ী, গত দুই মাসে বরিশালে আওয়ামী লীগের যত কর্মসূচি হয়েছে তার নেপথ্যে ছিলেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব হোসেন খান। সর্বশেষ ৪ এপ্রিল দুপুরে নগরীর সদর রোডে হওয়া বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজক ছিলেন শ্রমিক লীগের মান্না। তারা দুজনই বর্তমানে রয়েছেন ভারতে। সেখান থেকেই বরিশালে কর্মসূচি পরিচালনা করাচ্ছেন।
গোপন সাংগঠনিক কার্যক্রম
প্রকাশ্যে কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি খুব গোপনে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডও চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ। বর্তমানে পালিয়ে থাকা আওয়ামী আমলের ধনাঢ্য এক রেল ঠিকাদার ও বরিশালে অবস্থান করা একজন আইনজীবী নেতার সহায়তায় চলছে সংগঠন গোছানোর কার্যক্রম। এক্ষেত্রে বিএনপির কয়েকজন আইনজীবী নেতার সঙ্গে গোপন যোগাযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের জামিন করাচ্ছেন ওই আওয়ামী আইনজীবী নেতা। রেলের সাবেক ঠিকাদার নেতা দিচ্ছেন অর্থের জোগান। নগরীর সোনালি আইসক্রিম এলাকায় থাকা শ্রমিক লীগের এক নেতার বাড়িতে প্রায়ই মিলিত হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতারা। করণীয় সম্পর্কে বৈঠক আর ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণ হয় সেখানে।
নেতার বক্তব্য
পরিচয় না প্রকাশের শর্তে আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘বর্তমানে বিদেশে পালিয়ে থাকা সাদিক আব্দুল্লাহর তত্ত্বাবধানে চলছে বরিশাল জেলা ও মহানগরের কর্মসূচি। দল করলেও যারা খুব একটা চেনা মুখ ছিলেন না বরিশালে তাদেরই মূলত নামানো হচ্ছে রাজপথে। তাছাড়া এখানে দলের হাজার হাজার সক্রিয় নেতাকর্মী থাকলেও ৫ আগস্টের পর পালিয়েছেন সর্বোচ্চ ৮০-৯০ জন নেতা। বাকিরা এখনো আছেন নগরীতে। তাদের দিয়েই চলছে দল সংগঠিত আর সক্রিয় রাখার কাজ। এখানে দলের আইনজীবী নেতা যারা ছিলেন তাদের প্রায় কেউই যাননি আত্মগোপনে। প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে দলকে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে তারাও পালন করছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যে কারণে বর্তমানে কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারাও খুব সহজেই পাচ্ছেন সব রকম আইনি সহায়তা।’
পুলিশের ব্যর্থতা
প্রতিবার কর্মসূচি পালনের পর পুলিশ আওয়ামী লীগবিরোধী অভিযানে নামলেও ঠেকানো যাচ্ছে না কর্মসূচি। দু-একদিন পরপর মিছিলসহ নানা কর্মসূচিই যার বড় প্রমাণ। পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত দুই সপ্তাহে গ্রেফতার হয়েছে অর্ধশতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদের প্রায় সবাই নিরীহ প্রকৃতির। কর্মসূচি শেষেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন সক্রিয়রা। ফলে দিনশেষে কোনো কাজেই আসছে না এসব অভিযান।
বিএনপির অবস্থান
বিষয়টি সম্পর্কে আলাপকালে বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে আওয়ামী লীগের। তারা কী করছে বা না করছে তা দেখার দায়িত্ব পুলিশের। আমরা কেন রাজপথে নেমে সংঘাত-সংঘর্ষ করব? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেশে শান্তি বজায় রাখতে। দল থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ ব্যাপারে আমাদের কিছুই করার নেই।’
পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য
বরিশালের পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চোরের মতো হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের মিছিল করে পালিয়ে যাচ্ছে তারা। এগুলোকে তো রাজনৈতিক কর্মসূচি বলে না। তারপরও আমরা তাদের ঠেকাতে সম্ভব সবকিছু করছি। এমনো হয়েছে যে, মিছিল চলাকালেও অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকারিভাবে যেহেতু দলটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তাই যে কোনোভাবেই হোক তাদের প্রতিরোধ আর আইনগত ব্যবস্থা নেব আমরা।’



