ভারতের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া দেখা গেছে। পূর্ব ভারতে বিরোধীদের শেষ দুর্গ ভেঙে এবার পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। একই সঙ্গে টানা তৃতীয়বারের মতো ভূমিধস জয় নিয়ে আসামেও ক্ষমতায় ফিরেছে দলটি।
তামিলনাড়ুতে নতুন ইতিহাস
অন্য দিকে ভারতের দক্ষিণের রাজ্য তামিলনাড়ুতে তৈরি হয়েছে নতুন ইতিহাস। ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় প্রায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে অভিনেতা থেকে রাজনীতিতে আসা জোসেফ বিজয়ের নতুন দল ‘টিভিকে’। এর মাধ্যমে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র মতো দুই দ্রাবিড়ীয় পরাশক্তিকে পেছনে ফেলে এম কে স্টালিনের ডিএমকে সরকারের পতন ঘটিয়েছে তারা।
কেরালায় বাম সরকারের পতন
পরিবর্তন এসেছে কেরালাতেও। সেখানে পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকারের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ। এর ফলে ভারতের শেষ বামপন্থি সরকারেরও পতন ঘটলো। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে অল ইন্ডিয়া এনআর কংগ্রেস এবং বিজেপির সমন্বয়ে গঠিত এনডিএ জোটের ওপরই আস্থা রেখেছে মানুষ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের একটি স্পষ্ট বার্তা হলো, মানুষ পরিবর্তন চেয়েছে। আর সেই পরিবর্তনের ধাক্কায় পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল, তামিলনাড়ুর ডিএমকে থেকে শুরু করে কেরালার এলডিএফ সব ক্ষমতাসীন দলই ক্ষমতা হারিয়েছে। কেবল আসাম ও পুদুচেরি এই ধারার ব্যতিক্রম ছিল।
বাংলায় ভীতিমুক্ত নতুন অধ্যায়
বিজেপির এই অভাবনীয় পারফরম্যান্সে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের এই জয়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেছেন। নয়াদিল্লিতে বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলার ভবিষ্যতে এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো। এটি এখন ‘ভয়মুক্ত’ হয়েছে। মোদি আরও বলেন, গত বছর ১৪ নভেম্বর যখন বিহারের ফল এসেছিল, তখন বিজেপির এই সদর দফতর থেকেই আমি আপনাদের বলেছিলাম যে, বিহার হয়েই গঙ্গাজি গঙ্গাসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়। আজ গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর সর্বত্রই শুধু পদ্ম ফুটেছে। রাজ্যের রাজনৈতিক অভ্যাসের পরিবর্তন হওয়া দরকার। আজ যখন বিজেপি জিতেছে, তখন ‘বদলা’ নয়, ‘বদলে’র (পরিবর্তন) কথা বলতে হবে। ভয় নয়, ভবিষ্যতের কথা বলতে হবে... আসুন এই অন্তহীন সহিংসতার বৃত্তের অবসান ঘটাই।
বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীন বলেন, গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার গঠিত হচ্ছে। এটি কেবল ভৌগোলিক বিস্তার নয়; এটি আমাদের আদর্শ এবং বিশ্বাসের বিস্তার।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নিরঙ্কুশ আধিপত্য
৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এককভাবে যে দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন, ১৫ বছর পর তা গুঁড়িয়ে দিয়ে বিজেপির এই জয় এক বড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিজেপি তাদের শক্তিশালী ঘাঁটি উত্তরবঙ্গ ধরে রাখার পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও বড় ধরনের হানা দিয়েছে। গেরুয়া ঝড়ের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, সোমবার সন্ধ্যায় ভোট গণনা চলাকালেই মমতা সরকারের ২০ জনেরও বেশি মন্ত্রী তাদের নিজ নিজ আসনে পিছিয়ে ছিলেন।
২০২৪ সালে ওড়িশা জয়ের পর এবার পশ্চিমবঙ্গেও জয় পাওয়ায় দেশের পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর ভারতে বিজেপির নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো। অন্যদিকে এই ফলাফলের পর বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট এখন বেশ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে।
কেরালাতে জয় পাওয়ায় তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটকে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। তবে আসামে বিজেপির কাছে তারা বড় ব্যবধানে হেরে গেছে। ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপির রাজনৈতিক পরিধি অভাবনীয়ভাবে বেড়েছে। দলটির দাবি অনুযায়ী, ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে যেখানে তাদের বিধায়কের সংখ্যা ছিল ৭৭৩, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৯৮ জনে। পশ্চিমবঙ্গের এই জয়ের পর এখন বিজেপির একারই ১৭ জন মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন এবং এনডিএ জোটসহ এই সংখ্যা দাঁড়াবে ২২ জনে।
তামিলনাড়ুতে বিজয়ের ইতিহাস ও ঝুলন্ত বিধানসভা
বিজেপি যদি পশ্চিমবঙ্গে ইতিহাস গড়ে থাকে, তবে তামিলনাড়ুতে বিজয়ের দল টিভিকে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ১৯৬৭ সাল থেকে রাজ্যটিতে পালাক্রমে শাসন করে আসা ডিএমকে ও এআইএডিএমকে; এই দুই দ্রাবিড়ীয় দলকে স্তব্ধ করে দিয়েছে তারা। ভারতে এই প্রথম কোনও আঞ্চলিক দল গঠন হওয়ার এত অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষমতায় আসার নজির গড়লো।
ডিএমকে-বিরোধী হাওয়া এতটাই তীব্র ছিল যে, ক্ষমতাসীন দলটি তাদের শক্ত ঘাঁটি চেন্নাইয়েও পুরোপুরি পরাস্ত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিন তার কোলাথুর আসনে ৮ হাজার ৭৯৫ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেছেন। তার মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন সহকর্মীও পিছিয়ে ছিলেন। তবে তার ছেলে উদয়নিধি স্টালিন চেপাউক-তিরুভাল্লীকেনি আসন থেকে এগিয়ে ছিলেন।
অভিষেকেই বিজয়ের এই জয় ঐতিহাসিক। ভারতের নির্বাচনি ইতিহাসে এটি মাত্র তৃতীয় ঘটনা, যেখানে কোনও দল গঠনের দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ক্ষমতায় এসেছে। এর আগে ১৯৮৩ সালে এন টি রামা রাও দল গঠনের নয় মাসের মাথায় এবং ১৯৮৫ সালে আসাম গণ পরিষদ দল গঠনের দুই মাসের মাথায় ক্ষমতায় এসেছিল।
বিজয় পেরাম্বুর এবং তিরুচিরাপল্লী (পূর্ব) উভয় আসনেই এগিয়ে ছিলেন, তবে তার দল ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় এককভাবে ১১৪ আসনের ম্যাজিক ফিগার পার করতে পারেনি। এর অর্থ হলো, তামিলনাড়ু একটি ঝুলন্ত বিধানসভার দিকে যাচ্ছে, যেখানে একটি জোট সরকার অথবা অন্য কোনও দলের বাইরে থেকে দেওয়া সমর্থনের ভিত্তিতে টিভিকে সরকার গঠন করতে পারে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে টিভিকে এখন কংগ্রেসসহ ছোট দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। টিভিকে ১০৮টি আসনে জিতেছে অথবা এগিয়ে রয়েছে, যা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ১০টি কম। অন্যদিকে ডিএমকে-র সহযোগী দল কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, সিপিএম, সিপিআই, ভিসিকে এবং ডিএমডিকে ১৪টি আসনে জিতেছে বা এগিয়ে রয়েছে।
কেরালা ও আসামের চিত্র
পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে কেরালাতেও। সেখানে পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন এলডিএফ সরকার ২০২১ সালে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে ইতিহাস গড়েছিল। কিন্তু এবার কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। ১৪০টি আসনের মধ্যে ইউডিএফ ১০২টি আসনে জিতেছে বা এগিয়ে রয়েছে, যা কংগ্রেসের জন্য এক বড় স্বস্তি। ২০১৪ সালের পর থেকে কংগ্রেস মাত্র সাতটি রাজ্যে নির্বাচনে জিতেছিল। কেরালায় এটি তাদের অষ্টম জয়। ইউডিএফের এই জয়ের মুখে এলডিএফের আসন সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৩৫-এ, যার মধ্যে সিপিএম পেয়েছে ২৬টি এবং সিপিআই পেয়েছে ৮টি আসন।
পিনারাই বিজয়ন কম ব্যবধানে হলেও নিজের ধর্মাদম আসনটি ধরে রাখতে পেরেছেন। তবে তার মন্ত্রিসভার অনেক সদস্যই ইউডিএফ ঝড়ে হেরে গেছেন। অন্য দিকে কেরালায় অবস্থান তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া বিজেপি এই প্রথমবার সেখানে ৩টি আসনে জয় পেয়েছে। দলটির রাজ্য সভাপতি রাজীব চন্দ্রশেখর নেমন আসন থেকে এবং সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভি মুরলীধরন কাজাকুত্তম আসন থেকে ৪২৮ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তাদের জয়ী হওয়া তৃতীয় আসনটি হলো চাতান্নুর।
পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ু যখন নজিরবিহীন পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেখানে আসাম ছিল একদম ব্যতিক্রম। বিজেপি টানা তৃতীয়বারের মতো সেখানে জয় পেয়েছে। এমনকি দলটির আসন সংখ্যা ৬০ থেকে বেড়ে ৮২ হয়েছে। অন্যদিকে কংগ্রেসের আসন ২৯ থেকে কমে ১৯-এ নেমে এসেছে। মিত্র দলসহ বিজেপি ১২৬টি আসনের মধ্যে ৯৭টিতে এগিয়ে রয়েছে। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি গৌরব গগৈ জোরহাটে তার প্রথম নির্বাচনি পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছেন।
পুদুচেরিতে এনডিএ-র জয়
কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতে অল ইন্ডিয়া এনআর কংগ্রেস এবং বিজেপির সমন্বয়ে গঠিত এনডিএ জোট ক্ষমতা ধরে রাখতে চলেছে। ৩০টি আসনের মধ্যে এনআর কংগ্রেস ১২টিতে জিতেছে বা এগিয়ে রয়েছে। ডিএমকে ৫টি এবং বিজেপি ৪টি আসনে রয়েছে। বিজয় পরিচালিত টিভিকে দুটি আসনে জয় পেয়ে সেখানে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছে। অন্যদিকে এক সময় পুদুচেরি শাসন করা কংগ্রেস মাত্র একটি আসন পেয়েছে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস



