দুই দশক পর জিয়াবাড়িতে পদার্পণ, আবেগে আপ্লুত পরিবার
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় দুই যুগ পর নিজের পৈতৃক বাড়ি জিয়াবাড়িতে এসেছেন। সোমবার বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীতে পৌঁছালে জিয়া পরিবারের সদস্যরা ফুল দিয়ে তার স্বাগত জানান। এই সময় তার সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
আবেগঘন মুহূর্ত ও সেলফি তোলা
দীর্ঘদিন পর স্বজনরা তারেক রহমানকে কাছে পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফি তুলে এই বিশেষ মুহূর্তকে ধরে রাখেন। এরপর তিনি পুরো বাড়িটি ঘুরে দেখেন, যেখানে শুধুমাত্র জিয়া পরিবারের সদস্যরাই উপস্থিত ছিলেন। তিনি বাবার পুরোনো ঘরে প্রবেশ করে ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
তারেক রহমান নিজ বাড়িতে প্রায় দশ মিনিট সময় কাটান এবং বারান্দায় দাঁড়িয়ে পানি পান করেন। এই সময় তিনি বলেন, "প্রিয় বাগবাড়িবাসী, প্রায় দুই যুগ পর নিজের এলাকায়, নিজের গ্রামের বাড়িতে, এই স্কুল-কলেজ মাঠে আজ আবারও আপনাদের সঙ্গে একত্রিত হতে পেরেছি। আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পেরেছি - এর জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি।"
জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত আসবাবপত্র
বাড়ির ভেতরে এখনো জিয়াউর রহমানের ব্যবহৃত কিছু আসবাবপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি খাট, ড্রেসিং টেবিল, একটি সোফা ও কিছুসংখ্যক দৈনন্দিন আসবাব। এসবের মাধ্যমেই ঘরটির ভেতরে তখনকার জীবনযাপনের ছাপ স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। তবে জিয়াউর রহমান যে খাটে ঘুমাতেন, সেই খাটের সঙ্গে থাকা বোতাম লাগানো মশারি এবং জমিদার আমলের কিছু কাচের গ্লাস নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের স্বার্থে অনেক আগেই চট্টগ্রাম জাদুঘরে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক এসব নিদর্শন নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতেই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। বাড়িটিতে একটি বিশেষ কক্ষও রয়েছে, যা একসময় নিরাপত্তার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতো। ওই কক্ষে মূল্যবান সামগ্রী রাখা আছে। এসব দেখে অনেকটায় আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন তারেক রহমান।
২০০৬ সালের পর প্রথম আগমন
এর আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বরে সর্বশেষ পৈতৃক বাড়িতে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ, প্রায় বিশ বছর পর তিনি আবারো এই ঐতিহাসিক স্থানে ফিরে এসেছেন। এই দীর্ঘ বিরতির পর তার আগমন পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আবেগের সৃষ্টি করে।
জিয়াউর রহমানের শৈশব ও পারিবারিক ইতিহাস
পরিবারের বর্ণনা অনুযায়ী, মনসুর রহমানের দ্বিতীয় ছেলে জিয়াউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি। দাদা কামাল উদ্দিন মণ্ডল শখ করে নাতির নাম রাখেন জিয়াউর রহমান কমল। 'কমল' নামটি ছিল জিয়াউর রহমানের পারিবারিক ডাকনাম, যা পরিবারের ভেতরেই বেশি ব্যবহৃত হতো।
শৈশব ও কৈশোরের শুরুতে জিয়াউর রহমান বাগবাড়ী গ্রামেই বড় হন। তিনি স্থানীয় বাগবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তবে এই সময় তার বাবা মনসুর রহমান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। চাকরিসূত্রে পরিবারের সঙ্গে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের করাচিতে চলে যান।
এর ফলে দীর্ঘ সময় গ্রাম, আত্মীয়-স্বজন ও শৈশবের পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর জিয়াউর রহমান বাগবাড়ীতে এলে দীর্ঘদিন পর গ্রামের মানুষ ও আত্মীয়-স্বজন তাকে সরাসরি দেখার সুযোগ পান। সেসময় গ্রামে ব্যাপক আগ্রহ ও আবেগের সৃষ্টি হয় বলে প্রবীণরা জানান।
জিয়া বাড়ির ঐতিহাসিক পটভূমি
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জিয়াউর রহমানের পূর্বপুরুষরা ১৮৯৫ সালে বাগবাড়ী গ্রামে একটি একতলা পাকা বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রায় ১৩০ বছরের পুরোনো এই বাড়িটিই বর্তমানে 'জিয়া বাড়ি' নামে পরিচিত। বাড়িটির স্থাপত্য এখনো সেই সময়ের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০২ সালে বাড়িটিকে দোতলা করা হয়। এই সংস্কারের মাধ্যমে ঐতিহাসিক এই ভবনটির সংরক্ষণ নিশ্চিত করা হয়। জিয়া বাড়ি শুধু একটি ব্যক্তিগত বাসস্থানই নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
তারেক রহমানের এই সফর কেবল একটি ব্যক্তিগত দর্শনই নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ বিরতির পর পৈতৃক ভিটায় ফিরে আসা তারেক রহমানের জন্য যেমন আবেগের, তেমনি স্থানীয়দের জন্যও এটি একটি স্মরণীয় ঘটনা।



