ক্রসফায়ার মামলায় পুলিশ কর্মকর্তার জবানবন্দি, উজিরপুর থানা থেকে পুলিশ এনেছিলেন এসপি
ক্রসফায়ার মামলায় পুলিশ কর্মকর্তার জবানবন্দি

বরিশালের আগৈলঝাড়া থানার কেউ রাজি না হওয়ায় পাশের উজিরপুর থানা থেকে পুলিশ এনে ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে জেলাটির সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ ক্রসফায়ার দেন বলে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। বুধবার (১৭ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–২–এ এমন জবানবন্দি দেন সাক্ষী পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র) অসীম কুমার সিকদার।

মামলার পটভূমি

ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ক্রসফায়ার দেওয়ার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে তিনি জবানবন্দি দেন। তিনি ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ১২ মে পর্যন্ত বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ক্রসফায়ারের শিকার দুজন হলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাতীয়তাবাদী সামাজিক–সাংস্কৃতিক সংস্থা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা।

বিচার প্রক্রিয়া শুরু

এ মামলায় প্রথম সাক্ষী জবানবন্দি দেওয়ার আগে ট্রাইব্যুনালে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মো. সহিদুল ইসলাম সরদার। এর মধ্য দিয়ে এই মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হলো। এ মামলায় চার আসামি। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ পলাতক রয়েছেন। অপর দুই আসামি বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাক্ষীর জবানবন্দি

আজকে সূচনা বক্তব্যের পর প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দিতে পুলিশ পরিদর্শক অসীম কুমার সিকদার বলেন, ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাত দেড়টার দিকে আগৈলঝাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলামের মাধ্যমে জানতে পারেন, আগৈলঝাড়া থানাধীন বুধার সাকিনের বাইপাস মহাসড়কে কে বা কারা একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দিয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ওসি তাকে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে ফলবাহী পিকআপে আগুন জ্বলতে দেখতে পান। রাত দুইটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আগুন নেভানোর পর ফলের মালিক, পিকআপের মালিক ও ড্রাইভারদের খুঁজে পাননি।

ডিউটি শেষে থানায় এলে ওসি বলেন, বাদী না থাকায় তাকেই (সাক্ষী) এ বিষয়ে মামলা করতে হবে। এরপর বাধ্য হয়ে এজাহারে সই করেন তিনি। সেই এজাহারের ভিত্তিতে মামলা হয়।

ক্রসফায়ারের ঘটনা

২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ আগৈলঝাড়া থানায় আসেন উল্লেখ করে জবানবন্দিতে অসীম কুমার সিকদার বলেন, এসপি এসে ওসির কক্ষে বসেন এবং তাকে ডেকে পাঠানো হয়। তিনি (সাক্ষী) এলে এসপি তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের মামলায় এসআই নজরুল ইসলাম ঢাকা থেকে দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। আসামিদের নিয়ে আসা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ আছে তাদের ক্রসফায়ার দিতে হবে। এ কাজ তোমাকেই করতে হবে।’

তবে তিনি এ কাজে রাজি না হলে পুলিশ সুপার তাকে গালাগাল করেন এবং ওসির কক্ষ থেকে বের করে দেন। পরে জানতে পারেন, পুলিশ সুপার এভাবে আগৈলঝাড়া থানার সব অফিসারকে ডেকে নিয়ে একই প্রস্তাব দেন এবং কেউ রাজি হননি।

২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার দিকে আগৈলঝাড়া থানার উত্তর দিকে বাইপাস ব্রিজে দায়িত্ব পালন করছিলেন উল্লেখ করে অসীম কুমার সিকদার বলেন, রাত ২টার দিকে পুলিশ সুপারের গাড়ি তাদের অতিক্রম করে বুধার এলাকার দিকে যায়, যার পেছনে একটি মাইক্রোবাস ছিল। রাত সোয়া দুইটার দিকে বাইপাস ব্রিজ থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ দিক থেকে কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পান তিনি। আগুনের শিখার মতো কিছু একটা দেখতেও পান তিনি। শেষ রাতের দিকে তিনি থানায় ফিরে যান।

সকাল বেলায় ওসি বলেন, রাত সোয়া দুইটার দিকে গ্রেপ্তার আসামি আগৈলঝাড়া উপজেলার ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক মো. টিপু হাওলাদার এবং আগৈলঝাড়া উপজেলা জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. কবির মোল্লাকে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে। আগৈলঝাড়া থানার কোনো অফিসার ও ফোর্স এ ঘটনা সংঘটনে রাজি না হওয়ায় পুলিশ সুপার পার্শ্ববর্তী উজিরপুর থানা থেকে এএসআই মাহবুল ও এএসআই জসিমকে নিয়ে এ ঘটনা ঘটান।