বিচারপতি রাধা বিনোদ পালের ভিন্নমত রায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক আইনের ইতিহাসে এক মাইলফলক। টোকিও ট্রায়ালে তিনি একমাত্র বিচারক হিসেবে সব জাপানি অভিযুক্তের খালাসের পক্ষে মত দেন। তাঁর রায়ের মূল যুক্তি ছিল—যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় 'শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ' নামে কোনো আন্তর্জাতিক আইন বিদ্যমান ছিল না, তাই পূর্ববর্তী আইন প্রয়োগ 'নুল্লুম ক্রিমেন সিনে লেগে' নীতির লঙ্ঘন।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রাধা বিনোদ পাল। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশবে পিতৃহীন হয়ে মামার বাড়িতে পড়াশোনা করতে হয়েছে, মামার দোকানে কাজ করতে হয়েছে এবং প্রায়ই সাত মাইল দূরে স্কুলে পায়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে বিএ ও এমএ, ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে এলএলএম প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯২৪-২৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি তিনবার মর্যাদাপূর্ণ 'ট্যাগোর ল প্রফেসর' পদে নির্বাচিত হন, যা পূর্বে কেউ তিনবার পাননি। পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ১৯৪৪-৪৬ মেয়াদে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন।
টোকিও ট্রায়াল ও ভিন্নমত রায়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে মিত্রশক্তি ২৭ এপ্রিল ১৯৪৬ সালে 'ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট' গঠন করে, যা টোকিও ট্রায়াল নামে পরিচিত। জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের তত্ত্বাবধানে ১১টি দেশের ১১ জন বিচারক নিযুক্ত হন। ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে ড. রাধা বিনোদ পাল নিযুক্ত হন, যিনি পুরো বিচারক প্যানেলের মধ্যে একমাত্র আইনশাস্ত্রের পেশাদার বিশেষজ্ঞ ছিলেন। অভিযুক্ত করা হয় ২৮ জন জাপানি শীর্ষ নেতাকে 'এ' (শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ), 'বি' (প্রচলিত যুদ্ধাপরাধ) এবং 'সি' (মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ) অভিযোগে। উল্লেখযোগ্য যে, সম্রাট হিরোহিতো—যিনি যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিলেন—তাঁকে বিচারের আওতার বাইরে রাখা হয়।
রায় লেখার জন্য বিচারপতি পাল টোকিওর হোটেলে প্রায় স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে জাপানের ইতিহাস, সংস্কৃতি, দর্শন, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত প্রায় তিন হাজার বই পড়েন এবং ১ হাজার ২৩৫ পৃষ্ঠার এক ঐতিহাসিক ভিন্নমত রায় রচনা করেন। তিনটি মূল যুক্তি তিনি উপস্থাপন করেন: প্রথমত, যুদ্ধ শুরুর সময় 'শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ' বলে কোনো আন্তর্জাতিক আইন ছিল না; তাই পূর্ববর্তী বিচার 'নুল্লুম ক্রিমেন সিনে লেগে' (আইন ছাড়া অপরাধ নেই) নীতির লঙ্ঘন। দ্বিতীয়ত, উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো (ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস) নিজেরা এশিয়া-আফ্রিকা শোষণ করলেও জাপানের বিচার করছে, যা দ্বিচারিতা। তৃতীয়ত, তিনি হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন পারমাণবিক বোমা হামলার প্রসঙ্গ তোলেন—হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪ হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হন—এবং বলেন, জাপানকে যদি যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করা হয়, তবে এই গণহত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেরও বিচার হওয়া উচিত। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম এশিয়ান, যিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বোমা হামলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান।
জাপানে সম্মান ও স্বীকৃতি
বিচারপতি পালের রায় জাপানে তাকে জাতীয় বীরে পরিণত করে। ১৯৬৬ সালে সম্রাট হিরোহিতো তাকে জাপানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান 'ফার্স্ট অর্ডার অব দ্য সেক্রেড ট্রেজার' প্রদান করেন। টোকিওর ইয়াসুকুনি শ্রাইনে—যেখানে কেবল জাপানি বীরদের স্মরণ করা হয়—একমাত্র বিদেশি ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। ১৯৯৭ সালে টোকিওর ইয়াসুকুনি শ্রাইনে এবং কিয়োটোর রিয়োজেন গোকোকু জিনজা মন্দিরে তাঁর পাথরের স্মৃতিফলক স্থাপিত হয়। ১৯৭৪ সালে কানাগাওয়া প্রদেশের হাকোনে পাহাড়ে 'পাল-শিমোনাকা স্মৃতি জাদুঘর' স্থাপিত হয়েছে। জাপানের পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনী পড়ানো হয় এবং প্রতি বছর হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবসে লাখ লাখ জাপানি তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। ২০০৭ সালে তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ভারত সফরে এসে লোকসভায় বিচারপতি পালকে শ্রদ্ধা জানান এবং কলকাতায় গিয়ে তাঁর পুত্র প্রশান্তকুমার পালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
আন্তর্জাতিক আইনে অবদান
বিচারপতি পালের রায়ের তাৎক্ষণিক প্রভাব আদালতে সীমিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা আন্তর্জাতিক আইনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৫২ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের 'ইন্টারন্যাশনাল ল কমিশন'-এর সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর রায়ই প্রথমবারের মতো বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়—যুদ্ধাপরাধের বিচারে একটি স্থায়ী, নিরপেক্ষ ও সুসংগত আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো প্রয়োজন। এই উপলব্ধি থেকেই পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ধারণা বিকশিত হয়। আইনতত্ত্বের ক্ষেত্রে তিনি 'থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাপ্রোচেস টু ইন্টারন্যাশনাল ল' (টুয়েইল) মতবাদের বীজ রোপণ করেন, যা আজ একটি প্রতিষ্ঠিত আইনি মতবাদ। তিনি প্রশ্ন তোলেন—আন্তর্জাতিক আইন কি সত্যিকার অর্থে সব রাষ্ট্রের সমতার ভিত্তিতে গড়া, নাকি পশ্চিমা শক্তির আধিপত্য বজায় রাখার হাতিয়ার?
বাংলাদেশে বিস্মৃতি ও সময়ের দাবি
বাংলাদেশে বিচারপতি পালের জন্মভূমি কুষ্টিয়ার তারাগুনিয়া গ্রামে সরকারিভাবে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই। তাঁর নামে কোনো জাতীয় পুরস্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগ বা ভবনের নামকরণ নেই। পাঠ্যপুস্তকে তাঁর নাম নেই। অথচ জাপানে তিনি একজন জাতীয় বীর। সম্রাট হিরোহিতো কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছিলেন, 'যত দিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে বা অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু।' আজ জাপান বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদার। ২০১৬ সালে গুলশানের হোলি আর্টিজান হামলায় ৯ জন জাপানি নিহত হলেও জাপান বাংলাদেশকে ছেড়ে যায়নি।
বিচারপতি পাল ১৯৫২ সালে হিরোশিমায় প্রথম এশিয়ান শান্তি সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন এবং হিরোশিমার হোনশোজি বৌদ্ধমন্দিরে বাংলা ও সংস্কৃতে শান্তির বাণী লিখে যান, যা আজও পাথরের ফলকে খোদাই করা আছে। তিনি ১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবন ও রায় আজও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করা প্রত্যেক মানুষের অনুপ্রেরণা। জাপান তাঁকে মনে রেখেছে। এখন বাংলাদেশেরও সময় এসেছে তাঁকে স্মরণ করার—তাঁর নামে গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, জাতীয় পুরস্কার প্রদান এবং পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে।



