ময়মনসিংহে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা: চার তরুণের স্বীকারোক্তি
ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় পাঁচ বছরের একটি শিশুকে কদম ফুল দেওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে চার তরুণ মিলে ধর্ষণের পর অচেতন হয়ে গেলে নদীতে চুবিয়ে হত্যা করে মরদেহ কাদার মধ্যে পুঁতে রাখার ঘটনায় চার অভিযুক্ত আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার দুজন ও আজ বুধবার দুজন অভিযুক্ত তরুণ ময়মনসিংহ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তনয় সাহার আদালতে এই স্বীকারোক্তি দেন।
ঘটনার বিবরণ
গতকাল মঙ্গলবার আরিফ মিয়া (১৯) ও রাকিব মিয়া (২১) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আজ বুধবার বিকেলে মারুফ মিয়া (১৯) ও মো. সাঈম মিয়া (১৯) স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। নিহত শিশুর স্বজন ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত রোববার বিকেল পাঁচটার দিকে নিজ বাড়ির পাশ থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুটি নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান পাননি। পরে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শিশুটির বাড়ি থেকে ৫০০ গজ দূরে স্থানীয় লোকজন কংস নদের বাঁকে তল্লাশি চালিয়ে শিশুর মরদেহ নদীর তলদেশে পুঁতা অবস্থায় খুঁজে পান।
মরদেহ উদ্ধার ও মামলা
খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করে উদ্ধার করেন। রাতেই মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি হিসেবে গোসল করাতে নেওয়া হয়। তখন শিশুটির স্পর্শকাতর স্থানে ক্ষত দেখা যায়। ওই অবস্থায় দাফনের প্রস্তুতি বন্ধ রেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। এ ঘটনায় সোমবার রাতে শিশুটির বাবা বাদী হয়ে ধোবাউড়া থানায় দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেন। ওই মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করলেও এলাকার মারুফ মিয়া, আরিফ মিয়া, রাকিব মিয়া ও মো. সাঈম মিয়াকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
স্বীকারোক্তি ও পুলিশের বক্তব্য
পুলিশ জানিয়েছে, সন্দেহভাজন হিসেবে চার তরুণকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে তোলা হয়। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, তারা কদম ফুল দেওয়ার কথা বলে শিশুটিকে কৌশলে কংস নদের পাড়ে একটি জঙ্গলঘেরা স্থানে নিয়ে যান। সেখানে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়। শিশুটি নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে জীবিত অবস্থায় কংস নদে নিয়ে পানিতে চুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে কাদার মধ্যে পুঁতে রাখে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার ভয় থেকে তারা এই কাজ করেছেন বলে পুলিশকে জানিয়েছেন। ময়মনসিংহ আদালত পরিদর্শক মোস্তাছিনুর রহমান বলেন, পাঁচ বছর বয়সী শিশুটিকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গতকাল ও আজ চারজন ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে এবং ঘটনার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে তাদেরকে আদালত কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, ‘চাঞ্চল্যকর শিশুধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় চার অভিযুক্তকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্রুত যেন মামলাটি নিষ্পত্তি হয়, সে জন্য আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে পুলিশ প্রতিবেদন তৈরি করতে বলেছি।’
আইনজীবী সমিতির অবস্থান
আসামিদের পক্ষে আদালতে কোনো আইনজীবী না দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি নূরুল হক। তিনি বলেন, পাঁচ বছরের শিশুর সঙ্গে এমন নৃশংসতম ঘটনার জড়িত ব্যক্তিদের জন্য কোনো আইনজীবী যেন আদালতে না দাঁড়ায়, সে জন্য সমিতির সবাইকে বলে দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি নেতার সান্ত্বনা
এদিকে, আজ বুধবার বিকেলে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার শিশুটির পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে যান বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ। এ সময় তিনি নিহত শিশুটির মা–বাবাকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নিজের পক্ষ থেকে সান্ত্বনা দেন এবং পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন। এমরান সালেহ বলেন, ‘শিশুটির ওপর সংঘটিত এই নির্মম, বর্বর ও অমানবিক ঘটনায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ। এই নৃশংস ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রতি এমন পাশবিকতা গোটা সমাজকে লজ্জিত করেছে।’ ঘটনার দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গতকালই আইনমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। আইনমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, ঢাকার মিরপুরের পল্লবীতে শিশুধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচারের মতোই এই শিশুর ধর্ষণ ও হত্যা মামলারও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হবে।



