বাংলাদেশে শিশুরা আজ জীবনের প্রতিটি স্তরেই নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হচ্ছে। ঘরে-বাহিরে কোথাও তারা আর নিরাপদ নয়। কখনো সড়কে, কখনো ঘরের লোকের হাতে, কখনো আবার প্রতিরোধযোগ্য রোগের আক্রমণে তাদের জীবন অকালে নিভে যাচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান হার
সম্প্রতি পঞ্চগড়ের বোদায় বাবা-মায়ের সঙ্গে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাক্টরের ধাক্কায় রাস্তায় ছিটকে পড়ার পর চাকায় পিষ্ট হয়ে খুশি রানী নামের আট বছর বয়সী এক শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার কয়েক দিন আগে চুয়াডাঙ্গায় একইভাবে ভ্যান থেকে ছিটকে পড়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এই ধরনের ঘটনাগুলো যেন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে উঠছে। কেবল ২০২৫ সালেই সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮ জন শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।
শিশুদের এইরূপ 'ভালনারেবল' বা অরক্ষিত হয়ে পড়ার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে আর কোথাও আছে কি না, আমাদের জানা নেই। বর্তমানে একদিকে যখন হামের প্রকোপে ক্রমবর্ধমান হারে শিশুমৃত্যু ঘটছে, অন্যদিকে তখন সেইরূপ অবস্থার মধ্যেও পারিবারিক সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা।
শিশুর নিরাপত্তায় রাষ্ট্রীয় নীতির ব্যর্থতা
যেই সমাজে শিশুরা এইভাবে সর্বাধিক ঝুঁকির মধ্যে থাকে, সেই সমাজের ভবিষ্যৎও আর যাই হোক নিরাপদ থাকতে পারে না। বিজ্ঞজনেরা প্রায় বলেন, একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ধারিত হয় সেই সমাজে শিশুর নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মর্যাদা কতখানি নিশ্চিত করা গিয়েছে, তার উপর। কারণ শিশুরাই ভবিষ্যৎ নাগরিক, ভবিষ্যৎ কর্মশক্তি এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের ভিত্তি। ফলে শিশুর শৈশব যদি ভয়, দুর্ঘটনা ও অবহেলার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়, তাহলে তার অভিঘাত বহুকাল ধরে সেই জাতিকে বহন করতে হয়—ভবিতব্য এটাই।
উন্নত বিশ্বের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা কি তা দেখতে পাই না? শিশুদের সুরক্ষাকে তারা রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে। সড়কে বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় সেখানে যানবাহনের গতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। শিশুদের জন্য বিশেষ নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা, বাধ্যতামূলক শিশু আসন (চাইল্ড সিট), কঠোর সড়ক আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে প্রকৌশলগত পরিবর্তনকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। শুধু তা-ই নয়, শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য সামাজিক সহায়তাব্যবস্থার প্রশ্নে তারা আপসহীন। এই সকল সুসংহত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলেই মূলত তারা শিশুমৃত্যু ও নির্যাতনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পেরেছে।
কাঠামোগত ব্যর্থতা ও নীরবতার সংস্কৃতি
অন্যদিকে, আমাদের সমাজব্যবস্থায় শিশুদের সমস্যা কেবল একটি বা দুটি খাতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা যেন স্তরে স্তরে। সড়কে আইন অমান্য করা, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন চলাচল, স্বাস্থ্যসেবায় টিকাদানের ঘাটতি, পারিবারিক সহিংসতার নীরব সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি শিশু-সুরক্ষা আইনের দুর্বল প্রয়োগ—সবকিছু মিলিয়ে শিশুদের জীবন ক্রমাগত হয়ে উঠছে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। উদ্বেগের আরও কারণ হলো, এই ঘটনাগুলোকে আমরা প্রায়ই 'বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা' বলে বিবেচনা করি, অথচ বাস্তবে তা কাঠামোগত ব্যর্থতার প্রতিফলন বই আর কিছুই নয়।
বাস্তবতা হলো, শিশুকেন্দ্রিক জাতীয় নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার প্রশ্নে আমরা এখনো বহু পশ্চাতে রয়েছি। আমরা না রাস্তাঘাটে নিয়ন্ত্রিত চলাচল করি, না সড়ক নিরাপত্তা আইনের তোয়াক্কা করি, না শিশু সুরক্ষায় আইনের ধার ধারি। অধিকন্তু শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থে স্বাস্থ্য খাতে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাতৃ ও শিশুসেবা সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলোতেও আমরা যেন কাঙ্ক্ষিত আন্তরিক নই! আরও অমানবিক বিষয়, শিশু নিপীড়নের মতো ঘটনায় পর্যন্ত আমরা অনেক সময় 'নীরবতা পালন' করি।
অনিরাপদ শৈশব মানেই দুর্বল ভবিষ্যৎ
ক্রমাগত দুর্ঘটনা, রোগ ও সহিংসতায় শিশুদের জীবন এভাবে ঝরে গেলে তাতে কেবল ভুক্তভোগী পরিবারের স্বপ্নই ভঙ্গ হয় না—ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমগ্র জাতির মানবসম্পদ, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতি। অনিরাপদ শৈশব মানেই দুর্বল ভবিষ্যৎ। সুতরাং, সেই দুর্বল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রেরও।



