ঈদ সামনে রেখে ছিনতাই ও মলম পার্টির তৎপরতা: পুলিশের আহ্বান ও জনগণের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
ঈদ উৎসব সামনে রেখে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইকারী, অজ্ঞান পার্টি এবং মলম পার্টির সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অপরাধী শনাক্ত করতে জনগণকে এগিয়ে আসার জন্য পুলিশ কর্মকর্তারা আহ্বান জানিয়েছেন। তবে এই আহ্বান নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে: আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব যদি জনগণের ওপর পড়ে, তাহলে পুলিশের আসল ভূমিকা কী হবে?
পুলিশের আহ্বান ও পুরস্কারের ঘোষণা
শুক্রবার, ১৩ মার্চ তারিখে রাজধানীর গুলিস্তান বাস টার্মিনালে গণপরিবহনের চালক ও শ্রমিকদের নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং মালিক সমিতির একটি উদ্বুদ্ধকরণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার ছিনতাইকারী এবং মলম পার্টির সদস্যদের ধরিয়ে দিতে পরিবহন শ্রমিকদের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানান। তিনি এজন্য পুরস্কার প্রদানের ঘোষণাও দিয়েছেন।
পুলিশ কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেছেন, জনগণকে অপরাধী ধরতে বলা হয়নি; বরং অপরাধীদের শনাক্ত করে পুলিশকে সহায়তা করার কথাই বলা হয়েছে। ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার ব্যাখ্যা করেন, "প্রকৃতপক্ষে বাস টার্মিনাল এলাকায় মলমপার্টি বা ছিনতাইকারীদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে এবং গোপনে তাদের শনাক্ত করে পুলিশকে সহায়তা করার জন্যই পরিবহন শ্রমিকদের অনুরোধ করা হয়েছে। ধরার জন্য বলা হয়নি।"
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: গণপিটুনির ঝুঁকি
অপরাধ দমনে জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও, বিশিষ্টজনরা সতর্ক করেছেন যে অপরাধী ধরার দায়িত্ব যদি কার্যত জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে উল্টোভাবে গণপিটুনি বা ‘মব ভায়োলেন্স’-এর প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে নিরপরাধ মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, "অপরাধ দমনে জনগণের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও পুলিশেরই।" তিনি আরও যোগ করেন, "আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে যদি এমন ধারণা তৈরি হয় যে অপরাধী ধরার দায়িত্ব জনগণের, তাহলে সমাজে ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।"
বাংলাদেশে গণপিটুনির বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে চোর সন্দেহে, ছিনতাইকারী সন্দেহে কিংবা শিশুচুরির গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনির অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে মব বা গণপিটুনির ২৯টি ঘটনা ঘটেছে, যাতে ২১ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এ ধরনের ২৪টি ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং তাৎক্ষণিক ক্ষোভ—এই তিন কারণে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে পরে দেখা গেছে, যাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তিনি প্রকৃত অপরাধী ছিলেন না।
মলম পার্টি ও অজ্ঞান পার্টির সক্রিয়তা বৃদ্ধি
ঈদ মৌসুমে বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, ট্রেনস্টেশন এবং ভিড়পূর্ণ বাজার এলাকায় মলম পার্টি ও অজ্ঞান পার্টির সক্রিয়তা বাড়ার অভিযোগ নতুন নয়। এই দলগুলো যাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে খাবারে নেশাজাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে অজ্ঞান করা কিংবা শরীরে মলম লাগিয়ে অচেতন করে টাকা-পয়সা লুটে নেওয়ার কৌশল ব্যবহার করে। অনেকে অভিযোগ করেন, এসব এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি কম কিংবা নিষ্ক্রিয় থাকায় অপরাধীরা সহজেই পালিয়ে যেতে পারে।
অপরাধ দমনে পুলিশের দায়িত্ব ও জনগণের ভূমিকা
আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রতিরোধ এবং অপরাধী গ্রেফতার করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। পুলিশের কাজ হলো অপরাধ সংঘটনের আগেই তা প্রতিরোধ করা এবং ঘটনার পর দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা। তবে বাস্তবে দেখা যায়, ছিনতাই বা প্রতারণার ঘটনায় অনেক সময় স্থানীয় জনগণই প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, যখন মানুষ মনে করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছে না, তখনই জনগণ নিজেরাই ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ করতে চায়। এতে দুই ধরনের সমস্যা তৈরি হয়: একদিকে প্রকৃত অপরাধী শাস্তি এড়াতে পারে, অন্যদিকে নিরপরাধ মানুষও সন্দেহের ভিত্তিতে গণপিটুনির শিকার হতে পারে।
আইন অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তিকে অপরাধী প্রমাণের ক্ষমতা আদালতের। পুলিশ তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। কিন্তু জনতা যদি নিজেরাই কাউকে শাস্তি দেয়, তা আইনত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে জনগণ সন্দেহভাজন কাউকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দিতে পারে, কিন্তু মারধর বা শাস্তি দেওয়ার অধিকার তাদের নেই।
সমাধানের পথ: পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ ও জনসচেতনতা
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক অপরাধ কমাতে কয়েকটি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন:
- অপরাধপ্রবণ এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো
- বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা
- সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি করা
- দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম মোবাইল টিম গঠন করা
- জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "অপরাধ দমনে তাই জনগণকে অংশীদার করা প্রয়োজন, কিন্তু দায়িত্ব স্থানান্তর নয়। কারণ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি কোনোভাবেই নিরাপদ সমাজের পথ দেখায় না।"
ঈদ উপলক্ষে বাড়তে থাকা অপরাধের এই পরিস্থিতিতে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং আইনের শাসন বজায় রাখা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
