আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটরদের দুর্নীতি বিতর্ক: কোটি টাকা ঘুষ দাবির অডিও ফাঁস
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য নিযুক্ত প্রসিকিউটরদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সমালোচনার বিতর্ক থামছে না। বিরতি দিয়ে কিছুদিন পরপর সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে প্রসিকিউশনের দুর্নীতির তথ্য, যেখানে বেরিয়ে আসছে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অকাট্য প্রমাণ। মূলত চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারের জন্য পুনর্গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেখানে চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে জামায়াত সমর্থিত আইনজীবী মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ প্রায় ১৪ জন প্রসিকিউটর নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নিয়োগের পর তার আমলে চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনটি মামলার রায় ঘোষিত হয়। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর বিগত ২৩ ফেব্রুয়ারি চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে তাজুল ইসলামকে সরিয়ে নতুন করে অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশনে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ
তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে ‘রাজসাক্ষী বানিয়ে বাণিজ্যের’ অভিযোগ তোলেন প্রসিকিউশন টিমের অন্যতম সদস্য এবিএম সুলতান মাহমুদ। অভিযোগের প্রেক্ষিতে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, তিনি সদ্য নিয়োগ পেয়েছেন। তাই সবকিছু দেখেশুনে তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে দুর্নীতি অভিযোগ পেলে ছাড় দেওয়া হবেনা বলেও গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জানিয়েছিলেন তিনি। এদিকে প্রসিকিউটর এবিএম সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলে বিবৃতি দেন সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর হাজী এমএইচ তামিম।
কোটি টাকা দাবি করা অডিও ফাঁসের ঘটনায় নতুন বিতর্ক
আগের দুর্নীতির বিষয়গুলো বিবৃতি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকলেও নতুন করে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটরের সঙ্গে এক মামলার আসামির পরিবারের সদস্যদের ফোনালাপের রেকর্ড ফাঁস হওয়ায় নতুন করে বিতর্কে জড়ায় পূর্বের প্রসিকিউশন টিম। গত ৯ মার্চ জামিনের বিনিময়ে কোটি টাকা দাবি করার অভিযোগ সংক্রান্ত দুটি অডিও ফাঁস হয়। সদ্য পদত্যাগ করা প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে প্রসিকিউশন নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
ফাঁস হওয়া দুটি অডিও থেকে জানা গেছে, চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলা থেকে সাবেক এক সংসদ সদস্যকে ‘খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাসে’ এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির দর কষাকষি করছিলেন সাইমুম রেজা তালুকদার। অডিও’র কথোপকথনে ‘কিস্তিতে টাকা পরিশোধের’ আলোচনার পাশাপাশি, মামলা থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা হিসেবে বিএনপির এক সংসদ সদস্য এবং এক প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে তদবির করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে ঘুষ দাবির অভিযোগ ও অডিও’র সত্যতা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি দাবি করেন, “এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা।”
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও তদন্তের ঘোষণা
এসব অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট হুমায়রা নূর বলেন, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার জুলাই শহীদ আর আহতদের রক্তের সঙ্গে এভাবে বেঈমানি করেছেন। অভিযুক্তদের কাছ থেকে টাকা লেনদেনের অভিযোগ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেছেন। গাদ্দার এই লোককে অনতিবিলম্বে গ্রেফতার ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি।”
সাইমুম রেজা তালুকদারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সকালে ট্রাইব্যুনালের বর্তমান প্রসিকিউটরদের নিয়ে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। বৈঠকের পর চিফ প্রসিকিউটর জানান, এই অভিযোগের অভ্যন্তরীণ তদন্ত করবেন তারা। তিনি বলেন, “দুর্নীতির সঙ্গে কারও সুতা পরিমাণ সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তদন্তের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “এটা তো একটা সিরিয়াস অভিযোগ, এই অভিযোগ আমাদের কোনও প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে ওঠার কথা ছিল না। অভিযোগ যখন উঠেছে তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, আমরা এর প্রশ্রয় কেন দিয়েছি জানি না। হতে পারে আনুষ্ঠানিক কোনও অভিযোগ তার (সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম) কাছে আসেনি, মিডিয়াতে নানা অভিযোগ থাকলেও যতক্ষণ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও অভিযোগ আমাদের কাছে না আসবে, আমাদের পক্ষে তো এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকে না।”
আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, “ঘুষের বিষয়ে যদি কোনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমার কাছে আসে, আইনগতভাবে আমার যতটুকু ক্ষমতা আছে, আমি সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো। যদি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমার কাছে নাও আসে, আমি ব্যক্তিগতভাবে মানে, চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে একটা অভ্যন্তরীণ তদন্ত করবো। শুধু তাই না— আমি এই পার্টিকুলার বিষয়ে তো তদন্ত করবোই, ৫ আগস্টের পরে আমাদের এই ট্রাইব্যুনাল গঠন হওয়ার পরে, অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করে সব বিষয় তদন্ত করে দেখবো। কোনও অনিয়ম পেলে সেটা আমি আমার কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করবো। এ বিষয়ে প্রয়োজনে সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের সঙ্গেও কথা বলবো।”
আরও অডিও রেকর্ড ও ট্রাইব্যুনালে পরিবর্তনের পরিকল্পনা
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আসামির আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, এমন আরও অডিও রেকর্ড তাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তারা প্রয়োজনবোধে সেগুলো ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরবেন।
সূত্র জানায়, ট্রাইব্যুনালের চলমান বিতর্কের অবসান ঘটাতে বর্তমানে সচল দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে বিচারক পরিবর্তন করা হবে। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনেও পরিবর্তন আনা হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রসিকিউশন সূত্র আরও জানায়, প্রসিকিউটরদের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ট্রাইব্যুনালের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মূলত সেসব বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালের বিচারিক গতিকে সচল রাখা, সৃষ্ট বিতর্কের স্থায়ী অবসান ঘটাতে সময়ে সময়ে এসব পরিবর্তন আনা হবে। প্রয়োজনে একাধিক তদন্ত টিমও গঠন করা হবে। তবে এ বিষয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করতে রাজি নন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
