মাগুরা জেলা জজের সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ: বিচার বিভাগীয় নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন
মাগুরা জেলা ও দায়রা জজ মো. মিজানুর রহমানের সংস্কৃতিমন্ত্রী ও মাগুরা-২ আসনের সংসদ সদস্য নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার ঢাকার বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি ভবনে এই সাক্ষাৎ ঘটে, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছবি আকারে প্রকাশিত হয়েছে। ছবিতে দেখা যায়, মাগুরা জেলা আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে মন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হচ্ছে, এবং জেলা জজও উপস্থিত রয়েছেন।
আকস্মিক সাক্ষাৎ নাকি পূর্বপরিকল্পিত?
মাগুরা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহেদ হাসান দাবি করেছেন যে এই সাক্ষাৎ সম্পূর্ণ আকস্মিক ছিল এবং এটি কোনো পূর্বনির্ধারিত বৈঠক নয়। তিনি জানান, জেলা জজ ব্যক্তিগত ছুটিতে ছিলেন এবং অন্য প্রয়োজনে সেখানে গেলে করিডরে তাঁদের সাক্ষাৎ হয়। একইভাবে, জেলা জজ মো. মিজানুর রহমানও প্রথম আলোকে বলেছেন, তিনি বাংলা একাডেমিতে ব্যক্তিগত কাজে গিয়েছিলেন, যেখানে আকস্মিকভাবে আইনজীবী ও মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বলেন, ‘আইনজীবীরা যখন আমাকে ডাকলেন, সৌজন্যতার খাতিরে আমি না করতে পারিনি। এটা কোনো পূর্বপরিকল্পিত অনুষ্ঠান ছিল না।’
তবে, আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান (যিনি জেলা বিএনপির সদস্য) বলেছেন, তাঁরা সমিতির প্রতিনিধি হিসেবে সংস্কৃতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, এবং জেলা জজ তাঁদের সঙ্গে যাননি। তিনি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
বিচার বিভাগীয় নীতিমালা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদনক্রমে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রকাশিত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য অনুসরণীয় নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নীতিমালার ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচারকেরা যত দূর সম্ভব সভা-সমিতি, বিবাহ ও অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান থেকে বিরত থাকবেন; বিশেষত এমন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না, যেখানে মামলার পক্ষ বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সংযোগ ঘটতে পারে।
১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, বিচারক জনসমক্ষে রাজনৈতিক দলসমূহের ঊর্ধ্বে থাকবেন এবং তাঁদের আচরণ যেন কোনো দল বা মতাদর্শের পক্ষে বা বিপক্ষে না যায়। এছাড়া, ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচারক কোনো অবস্থাতেই মামলার পক্ষ, আইনজীবী বা স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো উপহার বা উপঢৌকন গ্রহণ করবেন না।
আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনা সামনে আসায় সামাজিক অনুষ্ঠানে বিচারকদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর জানুয়ারি মাসে এক আইনজীবীর চেম্বার উদ্বোধনের মিলাদ মাহফিলেও উপস্থিত ছিলেন ওই বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা। বিষয়টি নিয়ে বিচার বিভাগের দুজন কর্মকর্তা ও জেলার পাঁচজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক, কিন্তু তাঁরা কেউই নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে চাননি।
তাঁরা বলছেন, এমন ঘটনা বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও প্রভাবমুক্ত ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিচার বিভাগের শক্তি শুধু রায়ের মধ্যে নয়; বরং জনমানসে তার গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষ ভাবমূর্তির ওপরও নির্ভরশীল। এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত নয়, যাতে বিচারককে প্রভাবিত করা সম্ভব—এমন ধারণার জন্ম হয়।
সামগ্রিকভাবে, এই সাক্ষাৎ বিচার বিভাগীয় নীতিমালা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যদিও সংশ্লিষ্টরা একে আকস্মিক বলে দাবি করছেন। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে আরও সতর্কতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
