চকবাজার অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর: বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এবং ক্ষতিপূরণের অসম্পূর্ণতা
২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর চকবাজারের চুড়িহাট্টায় সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় ৭১ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ছিলেন মো. আসিফের বাবা জুম্মন ওয়াহেদ। আসিফের ভাষায়, ‘আমরা পাঁচ ভাই! আমার আব্বা একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডে বাবা মারা যাওয়ার পর আমার ওপর সংসারের দায়িত্ব আসে। দুই ভাইয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। আমি এখন কাপড়ের দোকানে চাকরি করি। বাবার মৃত্যুর পর আমাদের পুরো সংসার এলোমেলো হয়ে গেছে। আমরা কী অবস্থায় আছি, বলে বোঝাতে পারব না।’
মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি
অগ্নিকাণ্ডের পরদিন চকবাজার থানায় মামলা করেন মো. আসিফ। মামলাটি তদন্ত করে ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। আসামিরা হলেন ওয়াহেদ ম্যানসনের মালিক হাসান সুলতান, হোসেন সুলতান, রাসায়নিকের গুদামের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, পরিচালক মোজাম্মেল ইকবাল, ব্যবস্থাপক মোজাফফর উদ্দিন, মোহাম্মদ জাওয়াদ আতিক, মো. নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফ। তাঁরা আটজনই এখন জামিনে আছেন।
২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের পর ২৪ জুলাই সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। তবে গত সাত মাসে একজনও সাক্ষ্য দেননি। সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর পর থেকে গত আড়াই বছরে ১৬৭ জনের মধ্যে মাত্র ৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। সর্বশেষ গত বছরের ৩১ জুলাই সেলিম আহমেদ লিটন নামের এক দোকানদার সাক্ষ্য দেন। গত বছরের ১২ নভেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখে কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির না হওয়ায় আগামী ২৯ মার্চ পরবর্তী তারিখ ধার্য করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তো সমন পাঠাচ্ছি। এখন সাক্ষীরা কেন আসছেন না, সেটা তো আমরা জানি না। সঠিকভাবে পেশকার সমন পাঠান কি না, আমি সেটা দেখব। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিচারককে জানিয়েছি, মামলাটা দেরি হচ্ছে।’ ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, সাক্ষীরা সমন পেয়েও ঠিকমতো আদালতে হাজির না হওয়ায় মামলার বিচার শেষ হতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
ক্ষতিপূরণ ও প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে হতাশা
অগ্নিকাণ্ডের এক মাস পর ২০১৯ সালের ২৮ মার্চ ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উদ্যোগে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন মেয়র সাইদ খোকন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি দেন। ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ২১টি পরিবারের সদস্যকে দৈনিক মজুরিভিত্তিক মাস্টাররোলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি দেওয়া হয়। চারটি পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ বাবদ দুই লাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়। চারটি পরিবারকে অফিসার পদে চাকরি ও দুটি পরিবারকে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার জন্য কাগজ দেওয়া হয়।
তবে ভুক্তভোগী আসিফের মতে, ‘২১টি পরিবারকে মাস্টাররোলে চাকরি দেওয়া হলেও তাঁদের চাকরি এখনো স্থায়ী হয়নি। চারজনকে এখনো অফিসার পদে চাকরি দেওয়া হয়নি। দুজনের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা করে নিয়ে এখনো দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। আমার ছোট ভাই স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছিলেন। তিনি চাকরি পাননি।’
বিচার নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে আসিফ বলেন, ‘আমাদের যে এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল, তার খবর তো কেউ নেয় না। বিগত সরকারের পতন হয়েছে, সবার সবকিছু হয়েছে। কিন্তু আমাদের তো কোনো কিছু হইল না। রায়ই তো এখনো হইল না।’
সাত বছর পরও এই অগ্নিকাণ্ডের ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় রয়েছে। মামলার ধীরগতি এবং প্রতিশ্রুত সহায়তার অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
