বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য মাসদার হোসেনের হতাশা: প্রতিবেদন বাস্তবায়নে ব্যর্থতা
বিচার সংস্কার কমিশনের সদস্যের হতাশা: বাস্তবায়ন নেই

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য মাসদার হোসেনের তীব্র হতাশা: প্রতিবেদন বাস্তবায়নে ব্যর্থতা

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার মোট ১১টি ভিন্ন কমিশন গঠন করেছিল। এর মধ্যে বিচার বিভাগীয় সংস্কার কমিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ কমিশন হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে কমিশনের সদস্য হয়েও অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন এর অন্যতম সদস্য ও বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার বাদী মো. মাসদার হোসেন।

কমিশনের গঠন ও উদ্দেশ্য

বিচার বিভাগকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনক্রমে এই কমিশন গঠিত হয়েছিল। কমিশনে মোট ৮ জনকে সদস্য করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান।

বাকি সদস্যদের মধ্যে ছিলেন:

  • হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এমদাদুল হক
  • অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মো. ফরিদ আহমদ শিবলী
  • সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং মাসদার হোসেন বনাম রাষ্ট্র মামলার বাদী মো. মাসদার হোসেন
  • সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সাবেক জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ আমিনুল ইসলাম
  • সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন
  • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক (সুপন)
  • শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আরমান হোসাইন

প্রতিবেদন দাখিল ও বাস্তবায়নে ব্যর্থতা

বিচার বিভাগ নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি কমিশন একটি ৩৫২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করে। এই প্রতিবেদনে বিচার বিভাগের সংস্কারে কার্যকর পদক্ষেপসমূহ তুলে আনা হয়েছিল। তবে কমিশনের সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠিত হলেও প্রত্যাশিত সংস্কার না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন।

মাসদার হোসেন ছিলেন জেলা ও দায়রা জজ। অবসরের পর তিনি নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের মামলা করেছিলেন। তার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ উক্ত মামলার রায়ে দেশের অধস্তন আদালতের বিচারকদের সিভিল সার্ভিসের সদস্য হিসেবে গণ্য না করে একটি পৃথক সার্ভিস হিসেবে বিবেচনা করে। মাসদার হোসেন মামলার রায় ১৯৯৯ সালে ঘোষিত হলেও পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারসমূহ তা বাস্তবায়ন করেনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ ও বর্তমান অবস্থা

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের লক্ষ্যে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন এবং জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশন বিধিমালা, ২০০৭ প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে পৃথক জুডিসিয়াল সার্ভিস গঠন করে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করেন।

বিগত ১৮ মাসের বিচার বিভাগীয় সংস্কারের বিষয়ে মাসদার হোসেন বলেন, “বিগত ১৮ মাসে কি হয়েছে? গায়েবী মামলার যে চরিত্র (পূর্বের সরকারের আমলের) সেই চরিত্র কি অনুষ্ঠিত হয়নি? আমরা দেখেছি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তাগণ হাইকোর্টে গিয়ে শাউটিং করেছে যে—এই জামিনগুলো, এই ব্যক্তির জামিনগুলো (আবেদন) আপনারা শুনবেন না, এটা দেখবেন না। এর ধারাবাহিকতায় নিম্ন আদালতের বিচারকেরা আমাকে বলেছেন, ‘আজ যদি জামিন শুনি, কাল সকালে আমার বদলি অর্ডার হয়ে যাবে। এটা আমাকে রিজেক্ট করতে হবে।’ বিচারকদের প্রতি এরকম চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বিচার বিভাগ আগে থেকেই ফরমায়েশিতভাবে চলছে। এখনো সাহসিকতার সঙ্গে ন্যায়বিচার কার্যকর করার মানসিকতা আমাদের কয়জন বিচারকের আছে?”

হতাশা ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কা

হতাশা প্রকাশ করে মাসদার হোসেন আরও বলেন, “সংস্কারের যে আশা নিয়ে আমরা (বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন) গিয়েছিলাম, আমি ব্যক্তিগতভাবে হতাশ হয়েছি। জনগণের কল্যাণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ ভিজিবল হয়নি। নিরপেক্ষ বিচার ও জনসাধারণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষা করা যায়নি। এখানে চাঁদাবাজি হয়েছে, লুটপাট হয়েছে, মব জাস্টিস হয়েছে এবং অবিচার হয়েছে। স্বল্পতম সময়ের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার যদি এই বিষয়ে মেজারমেন্ট নিয়ে কাজ করত, তবে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো।”

এই মন্তব্যে বিচার বিভাগের সংস্কার প্রক্রিয়ার গতি ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে, যা বাংলাদেশের আইন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।