ভারত একটি বিশাল এবং বৈচিত্র্যময় দেশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে দেশটির সংবিধানে ক্ষমতার এক সুনিপুণ বণ্টন করা হয়েছে। এখানে কোনও একক ক্ষমতা কারও নেই। দেশটির সংবিধান অনুসারে দুই স্তরের সরকার ব্যবস্থা হয়েছে। একটা দিল্লিতে, অন্যগুলো রাজ্যের রাজধানীগুলোতে।
এখতিয়ার ও ক্ষমতা
রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটি মূলত তাদের এখতিয়ার বা ভৌগোলিক সীমানার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। রাজ্য সরকারগুলো দেশের একটি নির্দিষ্ট রাজ্য বা অঞ্চলের শাসনকাজ পরিচালনার ক্ষমতা রাখে। আর কেন্দ্রীয় বা ইউনিয়ন সরকার পুরো দেশ বা জাতীয় স্তরে কাজ করে এবং দেশের ওপর তাদের কর্তৃত্ব বজায় থাকে।
আইন প্রণয়নের ক্ষমতা
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট লোকসভা ও রাজ্যসভা নিয়ে গঠিত। অর্থ বিল শুধু লোকসভায় পাস হয়। রাজ্যসভা রাজ্যগুলোর স্বার্থ রক্ষা করতে চাইলেও সংখ্যালঘু হওয়ায় সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের দিকেই ঝোঁকে। অন্যদিকে রাজ্য বিধানসভা অধিকাংশ রাজ্যে এককক্ষবিশিষ্ট, তবে কয়েকটি রাজ্যে বিধান পরিষদ নামে দ্বিতীয় কক্ষও আছে। তবে বিধান পরিষদ তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
সংবিধানের সপ্তম তফসিলে বর্ণিত তালিকা অনুযায়ী রাজ্য সরকারগুলো কেবল ‘রাজ্য তালিকা’ভুক্ত বিষয় যেমন- পুলিশ প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার এবং কৃষির ওপর আইন তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন বিষয় যেমন- প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি, ব্যাংকিং এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোতে আইন প্রণয়ন করে।
যুগ্ম ক্ষমতা
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ‘যুগ্ম ক্ষমতা’ নামে আরও একটি বিশেষ ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারই ক্ষমতা চর্চা করতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে কোনও বিষয়ে যদি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আইনের মধ্যে বৈপরীত্য বা বিরোধ তৈরি হয়, তবে সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়। এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় সংহতি বজায় রাখা।
প্রশাসন
প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকেও এই দুই সরকারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। রাজ্য সরকারের নির্বাহী প্রধান হলেন মুখ্যমন্ত্রী, যিনি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ শাসন ও রাজস্ব ব্যয়ের তদারকি করেন। প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব আইনসভা থাকে যারা নিজ অঞ্চলের জন্য বিশেষ আইন প্রণয়ন করে। বিপরীতে, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি পুরো দেশের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের রয়েছে লোকসভা ও রাজ্যসভা নিয়ে গঠিত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ। কেন্দ্রীয় সরকার যেমন জাতীয় বাজেট ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে রাজ্য সরকারগুলোর ওপর নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণও বজায় রাখে।
শাসন
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মূল দায়িত্ব রাজ্যের, কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দেশ দিতে পারেন। গুরুতর অপরাধে কেন্দ্রীয় সংবাদ সিবিআই রাজ্যের অনুমতি ছাড়াই তদন্ত শুরু করতে পারে না। এখানে জটিলতা আছে। আর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলে রাজ্য কার্যত কেন্দ্রের অধীনস্থ হয়ে পড়ে।
রাষ্ট্রপতি বনাম গভর্নর
রাজ্যের প্রধান নির্বাহী গভর্নর মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর নিয়োগ দেন, বাজেট পাশ করান এবং রাজ্যে কেন্দ্রের নীতি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করেন। কিন্তু অতীতে অনেকবার দেখা গেছে যে, গভর্নর রাজ্যের বিল আটকে দেন বা সংবিধানের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে মনে করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠান। তখন স্বাভাবিকভাবেই কেন্দ্রীয় সরকারের মতামত প্রাধান্য পায়। রাজ্যপালের হাত ধরে কেন্দ্রীয় সরকার পরোক্ষভাবে রাজ্যের শাসনে হস্তক্ষেপ করতে পারে, এটিই সবচেয়ে বিতর্কিত দিক। উল্টোদিকে, রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে কাজ করেন এবং মূল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের হাতে থাকে।
আয়ের উৎস
কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান আয়ের উৎসগুলো হলো আয়কর, কর্পোরেট ট্যাক্স, কাস্টমস ডিউটি ও জিএসটির কেন্দ্রীয় অংশ। অন্যদিকে রাজ্য সরকারের আয়ের প্রধান খাতগুলো হলো জিএসটির রাজ্য অংশ, স্ট্যাম্প ডিউটি, বাণিজ্যিক কর এবং ভূমি রাজস্ব। তবে রাজ্যগুলোর আয়ের সিংহভাগই নির্ভর করে কেন্দ্রীয় অনুদান ও অর্থ কমিশনের সুপারিশের ওপর। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর গঠিত অর্থ কমিশন কেন্দ্রীয় করের একটি নির্দিষ্ট অংশ রাজ্যগুলোর মধ্যে বণ্টন করে দেয়। পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রাজ্যগুলো পায় প্রায় ৪১ ভাগ কেন্দ্রীয় কর। তবু এই নির্ভরতাই কেন্দ্র-রাজ্য টানাপড়েনের মূলে থাকে, কারণ রাজ্যগুলোকে তাদের খরচের অধিকাংশের জন্যই কেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।
স্বায়ত্তশাসন বনাম জাতীয় ঐক্য
রাজ্যগুলো জাতীয় আইন ও বিধিনিষেধের কাঠামোর মধ্যে থেকে নিজেদের স্থানীয় চাহিদা এবং লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে। স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান এবং জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা অটুট রাখতে এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন
ভারতীয় সংবিধানের ৩৫৬ ধারা কেন্দ্রকে সবচেয়ে বড় অস্ত্র দিয়েছে। যদি রাষ্ট্রপতি মনে করেন, কোনও রাজ্যে ‘সাংবিধানিক ব্যবস্থা ব্যাহত’ হয়েছে, অর্থাৎ রাজ্য সরকার ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না, তাহলে তিনি সেই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারেন। এর অর্থ হলো, রাজ্যের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হয়, বিধানসভা স্থগিত বা বিলুপ্ত করা হয় এবং রাজ্যের সব ক্ষমতা চলে যায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে। গভর্নর তখন রাজ্যের প্রশাসক হিসেবে কাজ করেন। সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসন চলে, তবে সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে বাড়ানো যায়। অনেক সময় রাজ্যে কে সরকার গঠন করবে, তা নিয়ে অস্থিরতা দেখা দিলেই এই ধারা প্রয়োগ করা হয়। অতীতে বহুবার এই ধারা ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী রাজ্য সরকারকে উৎখাত করেছে। যদিও পরে সুপ্রিম কোর্ট রুল জারি করে যে, সংবিধান ভঙ্গের স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা যাবে না।



