নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলাগুলোর 'বেশি শতাংশই মিথ্যা' বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, 'আইনের অপব্যবহার করে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনসহ যে কারও বিরুদ্ধে মামলা করে দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক অশান্তির কারণে প্রতিপক্ষকে হেয় করার জন্য এ ধরনের মামলা করে হয়রানি করা হয়।' এই বক্তব্যে প্রশ্ন উঠেছে, সত্যিই কি তাই? এই আইনে হওয়া মামলাগুলোর 'বেশি শতাংশই' কি মিথ্যা? তাহলে দেশে ব্যাপক হারে ঘটে যাওয়া শিশু ও নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানির ঘটনাগুলোও কি অসত্য?
নারী নির্যাতনের বাস্তব চিত্র
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মার্চ মাসেই দেশে ৪৪২ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১২৫ জন, আর গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৮ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২ জনকে। এছাড়া ৭০ জনের বেশি নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছিল। আর ২০২৫ সালে ২৮০৮ জন নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে। মোট ৭৮৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৪৩ জন কন্যা ও ২৪৩ জন নারী। এদের মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭৯ জন। (সূত্র: বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ)
মামলার সংখ্যা ও বিচার প্রক্রিয়া
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুসারে, গত এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে ধর্ষণের মামলা বেড়েছে ২৭ শতাংশের বেশি। গত বছর নারী নির্যাতনের যত মামলা হয়েছে, এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ধর্ষণ অভিযোগের, এই সংখ্যা ৭ হাজার ৬৮টি। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক নারী ৫১৭১ জন ও শিশু ১৮৯৭টি। ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে সারা দেশে মামলা হয়েছে ২১ হাজার ৯৩৯টি। নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা, সহিংসতার হুমকি, নিপীড়ন, হেনস্তা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি।
মিথ্যা মামলার অভিযোগ
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ১১ হাজারের বেশি মামলা তদন্ত করে ধর্ষণের ৪৪ শতাংশ অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আট বছরে ধর্ষণের অভিযোগে থানা ও আদালতে এসব মামলা করা হয়েছিল। তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রমাণিত না হওয়া মামলার অন্তত ৩০ শতাংশ সত্য। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে, বাদীর অনীহা, আর তদন্ত কর্মকর্তার অদক্ষতায় তদন্তে প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, বিচার চলাকালীন সময়ে নানা সংস্থার কার্যক্রম, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অভাব, তদন্তে ত্রুটি, ঠিকমতো আলামত সংগ্রহ না হওয়াসহ অন্যান্য দুর্বলতার কারণে মামলার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সাবেক পরিচালক, আইন ও সালিশ কেন্দ্র নীনা গোস্বামী বলেন, 'আমাদের অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। নারীরা সহজে মামলাটা করতেই চায় না। সেই মামলা বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে যদি প্রমাণিত না হয়, তার মানে অর্থ এই না যে এটি মিথ্যা মামলা। এসব ত্রুটি-বিচ্যুতির দায়তো নারীর না। নির্যাতিত নারীর জন্য ধীরে ধীরে বিচার পাওয়ার জায়গাটুকু সংকুচিত হয়ে যায়।'
মিথ্যা মামলার উদাহরণ
বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের মামলার অপব্যবহারের অভিযোগ যেমন আছে, তেমনই নির্যাতনের বিচার নারীরা পাচ্ছেন না, সেই অভিযোগও আছে অনেক বেশি হারে। 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০' কার্যকর হওয়ার পর পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেছিলেন, অসৎ মানুষ বিভিন্নভাবে এই আইনের অপব্যবহার করছে। জমিজমা সংক্রান্ত মামলাতেও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এমনকি নিজের মেয়ে ধর্ষণের শিকার—এই কথা বলতেও দ্বিধা করছে না। স্ত্রীর পরিবারের এক আত্মীয়ের সঙ্গে জমিজমা বিবাদ হলো মাসুদ হোসেনের (ছদ্মনাম)। পরবর্তীকালে সেটি হয়ে ওঠে পুরো পরিবারের সঙ্গে বিবাদ। এমনকি স্ত্রীর সঙ্গেও শুরু হয় সমস্যা। একপর্যায়ে স্ত্রীর পরিবার তার বিরুদ্ধে যৌতুকের ও নারী নির্যাতনের মামলা করেছিল। আদালতে মামলা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হলে মাসুদ ছাড়া পান। স্ত্রী নির্যাতনের মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন কাশেম আলি, পরে উল্টো উচ্চ আদালতে মামলা করে জয়ী হয়েছেন তিনি। (সূত্র: বিবিসি বাংলা)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক খন্দকার ফারজানা রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, এমন মামলা মূলত হচ্ছে নানাজনের বুদ্ধিতে। মন্ত্রণাদাতা প্রথমত হচ্ছে পরিবারের লোক ও আত্মীয়স্বজন। কিন্তু এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন উকিল। মানুষ যখন মামলা করেন, তখন শুরুতেই একজন উকিলের কাছেই যান। অনেক সময়ই উকিলের কথাতেও এমন মামলা হয়।
সরকারের অবস্থান
সরকার আইনে কিছু পরিবর্তন আনাটা কেন প্রয়োজন বলে মনে করছে, গণমাধ্যমের এই প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, 'এই আইনগুলো করার পরে দেখা যাচ্ছে যে, এর কিছু অপব্যবহার করা হয়। যেমন- ধরুন স্বামীর সাথে বিরোধ, তখন শ্বশুরবাড়ির সবাইকে জড়িয়ে মামলা করা হচ্ছে। এমনও দেখা গেছে, তারা কিছুই জানে না। এসব বিবেচনায় রেখে আমরা মনে করছি যে, এমন কিছু দরকার। তাই বিশেষ আইনে যৌতুকের মিথ্যা মামলার বিষয়টি সংযুক্ত করতে চাচ্ছি।'
বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা
প্রায় ৭ বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট যখন কিছু বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে নির্দিষ্টভাবে নারী নির্যাতন মামলার কথা ছিল না। সেই সময় একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়— দেশের প্রায় ১০ ধরনের ট্রাইব্যুনালে করা সব ধরনের মামলার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাই উচ্চ আদালতের নির্দেশে সব থেকে বেশি স্থগিত থাকছে। সারা দেশের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা উচ্চ আদালতে যে হারে স্থগিত হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি হারে নারীর মামলা স্থগিত হয়।
২০১৮ সালের ৮ মার্চ থেকে ২৩ মে সময়কালে প্রকাশিত প্রথম আলোর ছয় পর্বের একটি বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে সব অপরাধের মামলায় দণ্ডলাভের গড় হার ১৫ শতাংশের বেশি। অথচ ঢাকাতেই নারী নির্যাতনের গুরুতর ছয়টি অপরাধের মামলায় সাজার হার ৩ শতাংশের কম।
উপসংহার
মিথ্যা মামলার ধারণার মধ্যে আটকে না থেকে সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা, তদন্ত কর্মকর্তা বদলি হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগের সহজ ব্যবস্থা করা, আর আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। নারী নির্যাতন মামলাকে অস্বীকার না করে এর লুপহোলগুলো খুঁজে, সর্বোচ্চ দ্রুততায় নিষ্পত্তি হলে সবার লাভ হবে।



