ফরিদপুরের সালথায় এলাকার আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই গ্রাম্য মোড়লের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এই বিরোধের জেরে প্রায়শই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে, যার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। হামলা-পাল্টা হামলায় ভাঙচুর করা হচ্ছে শত শত বসতবাড়ি। এতে অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন, অনেকে পঙ্গুত্বও বরণ করেছেন।
সাম্প্রতিক সহিংসতা
সম্প্রতি উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের বালিয়া গট্টিবাজার, আড়য়াকান্দী ও মিরের গট্টি এলাকায় একের পর এক সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ সোমবার (৪ মে) সকালে মিরেরগট্টি গ্রামে হামলা চালিয়ে অন্তত ২০-২৫টি বাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। এর আগে রোববার দুপুরে নুরু মাতুব্বরের সমর্থক আনোয়ার শেখকে (৩০) পিটিয়ে আহত করে জাহিদের সমর্থকরা। এর কিছু সময় পর জাহিদের সমর্থক রেজাউলকে মারধর করে নুরু মাতুব্বরের সমর্থকরা। সোমবার সকালে নুরু মাতুব্বরের ছেলে রাজিব মাতব্বরকে (৩২) কুপিয়ে আহত করে জাহিদের সমর্থকরা। পরে নুরু মাতুব্বরের সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জাহিদের সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে অন্তত ২০-২৫টি বসতবাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
দুই মোড়লের পরিচয় ও পটভূমি
গট্টি ইউনিয়নের আধিপত্য বিস্তার ও এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আড়ুয়াকন্দী গ্রামের ইউপি সদস্য নুরু মাতুব্বরের সঙ্গে বালিয়া গট্টি গ্রামের জাহিদ মাতুব্বরের বিরোধ চলে আসছে। এলাকায় তারা দুইজন গ্রাম্য মোড়ল হিসেবে পরিচিত। এক সময় নুরু ও জাহিদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা বিএনপিতে যোগ দিয়ে এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। এর পর থেকে দুই মোড়লের সমর্থকদের মধ্যে অন্তত ১০টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যাতে শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। সহিংসতার সময় ভাঙচুর করা হয়েছে অন্তত দুই শতাধিক বসতবাড়ি, এমনকি কয়েকটি বাড়িতে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষক ও চাকরিজীবী বলেন, গট্টি, বালিয়া, আড়ুয়াকান্দী, মিরের গট্টি ও কানৈড় গ্রামের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছেন নুরু মাতব্বর ও জাহিদ মাতব্বর। তাদের সঙ্গে কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ গ্রাম্যদল না করলে এলাকায় বসবাস করা মুশকিল হয়ে পড়ে। এই দুই মোড়ল এলাকায় সহিংসতা সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করে সংসার চালান। তাদের আর কোনো কাজ নেই। তারা পক্ষের নামে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে শাসন করে। তাদের হাত থেকে কেউ রেহাই পাচ্ছে না। তারা আরও বলেন, পুলিশ এসব মোড়লকে আইনের আওতায় আনতে তেমন ভূমিকা নিচ্ছে না। মামলা হলেও অজ্ঞাত কারণে আটক করা হয় না।
নুরু মাতব্বরের বক্তব্য
নুরু মাতব্বর বলেন, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে জাহিদ ও আজাদ মাতুব্বরের সমর্থকরা আমাদের ১০-১২ জনকে পিটিয়ে-কুপিয়ে পঙ্গু করে ফেলেছে। থানায় অভিযোগ দিলে তা নেওয়া হয় না। পুলিশ তাদের পক্ষে কাজ করে। পুলিশ শক্ত ভূমিকা নিলে এমন পরিস্থিতি হতো না। আজও আমার ছেলেসহ কয়েকজনকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করেছে।
জাহিদ মাতব্বরের বক্তব্য
জাহিদ মাতব্বর বলেন, আমার কোনো সমর্থক নেই। আমি এখন নিজেও অসুস্থ। আমি আজ থেকে কোনো রাজনীতি, মাতব্বরি বা ঝুট-ঝামেলার মধ্যে নেই। আমি সবকিছু ছেড়ে আমার পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।
পুলিশের বক্তব্য
সালথা থানার ওসি মো. বাবলুর রহমান খান বলেন, দুই মাতুব্বরের মধ্যে এলাকার আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একের পর এক হামলা, মামলা, বাড়ি-ঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। পুলিশ খবর পেয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিরপেক্ষভাবে কঠোর ভূমিকা পালন করছে। এখানে কারো পক্ষ নেওয়া হচ্ছে না। নুরু মাতুব্বরের বক্তব্য সঠিক নয়।
প্রশাসনের বক্তব্য
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. দবির উদ্দীন বলেন, এলাকায় শান্তির লক্ষ্যে সহিংসতায় জড়িত মোড়লদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষ যাতে শান্তিতে বসবাস করতে পারে সেজন্য আমরা কাজ করছি। আমরা এলাকার পরিবেশ ভালো রাখতে উভয়পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। কোনোভাবেই এলাকা অশান্তকারীদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।



