হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: বিচার এখনও আপিল বিভাগে অপেক্ষমাণ
হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: বিচার এখনও আপিল বিভাগে

রাজধানী ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্ণ হলো। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতের ওই হামলায় বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জন নিহত হন। দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত এই মামলায় বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে রায় হলেও এখনও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। এখন মামলাটি রয়েছে আপিল বিভাগের শুনানির অপেক্ষায়।

যেভাবে ঘটেছিল হামলা

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির (আত্মঘাতী) সদস্যরা। হামলায় বিদেশি নাগরিকসহ ২০ জন নিহত হন। জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারান পুলিশের দুই কর্মকর্তা। পরে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। এ ঘটনার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জঙ্গিবাদ দমনে ব্যাপক অভিযান শুরু করে।

তদন্ত ও বিচারিক আদালতের রায়

হামলার পর পুলিশ বাদী হয়ে গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে। প্রায় দুই বছরের তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলার বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন। একই সঙ্গে আসামি মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস দেওয়া হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে আবু জাররা (র‌্যাশ), হাদিসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, আব্দুস সবুর খান (হাসান) ওরফে সোহেল মাহফুজ, শরিফুল ইসলাম এবং মামুনুর রশিদ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড কমে আমৃত্যু কারাদণ্ড

রায়ের পর ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। একইসঙ্গে দণ্ডিতরা জেল আপিল করেন। মামলার ২ হাজার ৩০৭ পৃষ্ঠার নথি পর্যালোচনার পর শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠন করা হয়। ২০২৩ সালের শুরুতে ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের শুনানি শুরু হয়ে ১১ অক্টোবর শেষ হয়। একই বছরের ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের দেওয়া সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।

কেন কমানো হয় সাজা

২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেন, হোলি আর্টিজানে সরাসরি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল পাঁচ জঙ্গি—রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল এবং খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। তারা ঘটনাস্থলেই নিহত হওয়ায় তাদের বিচার সম্ভব হয়নি।

আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামির কেউ হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না কিংবা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেননি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(১)(ক)(অ) ধারার অভিযোগ প্রযোজ্য নয়। তবে পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, অর্থ ও অস্ত্রের জোগান, জঙ্গি নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে হামলা সংঘটনে ভূমিকা রাখার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে একই আইনের ৬(১)(ক)(আ) ধারা প্রযোজ্য বলে মত দেন আদালত। এর ভিত্তিতে বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

এখন আপিল বিভাগের অপেক্ষা

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর দণ্ডিত আসামিরা আপিল বিভাগে আপিল করেন। রাষ্ট্রপক্ষও এ বিষয়ে আবেদন করেছে। মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মামলাটি আপিল বিভাগে অপেক্ষমাণ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আপিল বিভাগে মামলা দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ মামলার ক্ষেত্রেও আমাদের উদ্যোগের ঘাটতি হবে না। তবে কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আপিল বিভাগে বর্তমানে মাত্র পাঁচজন বিচারপতি রয়েছেন এবং মামলার চাপও অনেক। তারপরও রাষ্ট্র বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘হলি আর্টিজানের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে কয়েকজন বিদেশি নাগরিক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।’