সি প্রোগ্রামিংয়ের কবিতাময় ছন্দ: কম্পিউটারের মাতৃভাষার প্রতি এক প্রোগ্রামারের গভীর ভালোবাসা
সালেহ উদ্দিন আহমদ তখন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব লুজিয়ানার পিএইচডি প্রোগ্রামের একজন ছাত্র। তাঁর কম্পিউটারবিজ্ঞানের পড়াশোনার শুরু থেকেই প্রোগ্রামিং ভাষাগুলোর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। জাভা, পাইথন, রুবির মতো ভাষাগুলো শিখলেও, তাঁর হৃদয়ে সবসময় জায়গা করে নিয়েছে ‘সি’ প্রোগ্রামিং ভাষা।
কম্পিউটারের মাতৃভাষা হিসেবে সি
সালেহ উদ্দিনের মতে, ‘সি’ হলো কম্পিউটারের মাতৃভাষা। অন্য ভাষাগুলো অনেকটা বিদেশি ভাষার মতো, প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু সি-তে প্রোগ্রাম লিখতে গেলে তিনি কবিতার মতো ছন্দ খুঁজে পেতেন। অবোধ্য শব্দ, ক্রিপটিক শব্দবিন্যাস, ইনডেন্টেশন দিয়ে আঁকাবাঁকা বাক্যে লেখা—এ সবই তাঁর কাছে শৈল্পিক মনে হতো।
ছন্দের গুরুত্ব: যেকোনো কাজে ছন্দ লাগে, ছন্দ কেটে গেলে কাজটা ভন্ডুল হয়ে যায়। প্রোগ্রামিং ব্যাপারটাও তাই। সব প্রোগ্রামিং ভাষায় ছন্দ অত ভালো হয় না, যেমন হয় সি-তে। উদাহরণস্বরূপ, অন্য ভাষায় এ-এর মান ১ বাড়াতে এ = এ+১ লিখতে হয়, কিন্তু সি-তে এটি লেখা যায় এ++ হিসেবে—সংক্ষিপ্ত ও দক্ষ।
কর্মজীবনে সি-এর ভূমিকা
কম্পিউটার–কর্মজীবনের প্রাতঃকালে সি ভাষা সালেহ উদ্দিনকে অনেকভাবে সাহায্য করেছে। চাকরি পেতে, চাকরি বজায় রাখতে, এমনকি সহকর্মীদের তাক লাগিয়ে দিতে সি-এর দক্ষতা কাজে লেগেছে। অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রোগ্রামিং ছেড়ে বড় দায়িত্ব নিলেও, সি-কে কখনো ছাড়েননি।
পিএইচডি ও আর্থিক সংকট
কর্মজীবনের মধ্য পথে সালেহ উদ্দিন পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হন। দীর্ঘ সময় ও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, বিশেষ করে আর্থিক সংকটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া অল্প টাকা সংসার চালাতে পর্যাপ্ত ছিল না। তিনি বিভিন্ন অধ্যাপকের কাছে ধরনা দেন, আশ্বাস পেলেও কাজ পাননি।
হঠাৎ একদিন, আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামের প্রধান ড. জ্যাকসনের কাছ থেকে ই–মেইল পান। সি প্রোগ্রামিং কোর্স পড়াতে একজন ইনস্ট্রাক্টর দরকার, তিনি সালেহ উদ্দিনকে জিজ্ঞেস করেন। সালেহ উদ্দিন লুফে নেন এই সুযোগ, কারণ একদিকে তাঁর প্রিয় ‘সি’ ভাষা, অন্যদিকে সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস করে ৮০০ ডলার বেতন—যা তাঁর আর্থিক সংকট কিছুটা লাঘব করে।
চাকরির সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
একদিন পত্রিকায় নিউ অরলিন্সের নেভিগেশন ডেটা সিস্টেমস কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখেন, যেখানে জিপিএস নিয়ে কাজ করতে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী দরকার। তখন তাঁর গ্রিন কার্ড ছিল না, তাই আশা না করেই দরখাস্ত দেন। ইন্টারভিউতে ড. এডমুন্ড ক্রিস্টির সঙ্গে পরিচয় হয়, যিনি কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও টেকনিক্যাল ডিরেক্টর।
ক্রিস্টি কোনো টেকনিক্যাল প্রশ্ন না করে কাজটা বুঝিয়ে দেন এবং একটি শর্ত দেন: ‘কোম্পানিতে ফোরট্রান ল্যাঙ্গুয়েজ ছাড়া অন্য কোনো ভাষা অ্যালাও করব না। সি-তে ওই সব পয়েন্টার খুব ঝামেলার, তাই ফোরট্রানে কাজ করতে হবে।’ সালেহ উদ্দিন রাজি হন, যদিও মন খারাপ হয় সি ব্যবহার না করতে পেরে।
গোপনেই সি-তে কাজ শুরু
চাকরি হয়ে যাওয়ার পর সালেহ উদ্দিন বুঝতে পারেন, এই কাজ ফোরট্রানে সম্ভব নয়, কারণ ম্যাপিং ও গ্রাফিকস ডিসপ্লের জন্য প্রয়োজনীয় লাইব্রেরি ফোরট্রানে নেই। বিপদে পড়ে তিনি গোপনে কাজটা সি ভাষায় করা শুরু করেন। ক্রিস্টিকে মাঝেমধ্যে অগ্রগতি দেখাতে হয়, কিন্তু তিনি কখনো ভাষা সম্পর্কে জানতে চাননি, শুধু কাজের মানে খুশি হন।
দুই বছর পার হয়ে যায়, সালেহ উদ্দিনের গ্রিন কার্ডও চলে আসে। তখন তিনি ক্রিস্টিকে সত্য কথা বলেন—পুরো প্রজেক্ট সি-তে করা হয়েছে। ক্রিস্টি হেসে কিছু বলতে গিয়েও থমকে যান, হয়তো বলতে চেয়েছিলেন ‘সেটা তো আমি আগেই জানতাম’ বা ‘তুমি দেখছি বড্ড অবাধ্য লোক!’
এই গল্পটি শুধু প্রোগ্রামিংয়ের নয়, বরং আবেগ, সংগ্রাম ও সাফল্যের এক মিশ্রণ, যা কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
