বরিশালের মামা-ভাগ্নের যুগান্তকারী আবিষ্কার: থান্ডারবোল্ড মিসাইল ও রকেট
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার দুই মেধাবী শিক্ষার্থী, যারা মামা-ভাগ্নে সম্পর্কে আবদ্ধ, তারা একটি অভিনব মিসাইল ও রকেট তৈরি করেছেন। এই আবিষ্কার, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'থান্ডারবোল্ড মিসাইল এবং রকেট', দেশের প্রতিরক্ষা সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় দেশের স্বার্থে নিজেদের উদ্যোগ ও অর্থায়নে তারা এ প্রকল্পটি হাতে নেন।
আবিষ্কারের পেছনের গল্প
আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলা ইউনিয়নের উত্তর শিহিপাশা গ্রামের বাসিন্দা প্রিতম পাল ও তার মামা সুজন চন্দ্র পাল ৬-৭ মাস আগে এই যুগান্তকারী কাজ শুরু করেন। প্রিতম পাল ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র, অন্যদিকে সুজন চন্দ্র পাল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করছেন। তাদের মধ্যে রোবটিক্সের প্রতি গভীর আগ্রহ ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ এই আবিষ্কারের পথ সুগম করেছে।
নিজেদের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে এবং পরিবারের আর্থিক সহযোগিতায় ২০২৫ সালে শুরু করে ৬-৭ মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে তারা ৭ লাখ টাকা ব্যয় করে মিসাইল ও রকেটের কাজ সম্পন্ন করেছেন। এই মিসাইল ও রকেট ৫ কিলোমিটার রেঞ্জে ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম, যা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। তবে, সরকারের অনুমতি ছাড়া তারা এটি নিক্ষেপ বা উড্ডয়ন করতে পারছেন না, যা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেধাবী শিক্ষার্থীদের পূর্বসাফল্য
প্রিতম পাল ও সুজন চন্দ্র পাল উভয়েই রোবটিক্স সেক্টরে তাদের দক্ষতার জন্য ইতিমধ্যে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তারা আইডিইএ প্রকল্প থেকে ১০ লাখ টাকার ফান্ড পেয়েছিলেন এবং নাসা প্রকল্পের প্রতিযোগিতায় সেরা দশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। প্রিতম পাল রোবটিক্স হাত ও স্মার্ট সিটি তৈরি করে ২০২৪ সালের ৪৫তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে স্বর্ণপদক এবং বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে রৌপ্যপদক পেয়েছেন। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল মেধা অন্বেষণে ২০২৪ সালে উপজেলা পর্যায়ে বিজ্ঞানে বর্ষসেরা মেধাবী পুরস্কারও তার ঝুলিতে রয়েছে।
সুজন চন্দ্র পাল ২০২২ সালে একটি রোবট আবিষ্কার করেন, যা আগুন লাগা ও গ্যাস লিকেজের সংকেত দিতে সক্ষম। এই উদ্ভাবনের জন্য তিনি ২০২৩ সালে ৪৪তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। তাদের এই সাফল্যগুলো থান্ডারবোল্ড মিসাইল ও রকেট তৈরির ভিত্তি রচনা করেছে।
সম্পর্কিত ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়া
প্রিতম পালের পিতা ও ইউপি সচিব গৌতম পাল সাংবাদিকদের বলেন, "আমার ছেলে প্রিতম পাল টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে এবং আমাদের কাছ থেকেও টাকা নিয়ে এ আবিষ্কার করেছে। আমরা তাদের কাজে গর্বিত, তারা যেন দেশের সেবায় কাজ করতে পারে এজন্য সরকার ও দেশবাসীর কাজে সহযোগিতা ও দোয়া চাই।"
সুজন চন্দ্র পাল জানান, স্কুলজীবন থেকেই তার আবিষ্কারের প্রতি আগ্রহ ছিল। তিনি বলেন, "তার ধারাবাহিকতায় কম্বাইন করে আমরা থান্ডারবোল্ড মিসাইল এবং রকেট তৈরি করেছি। ভবিষ্যতে বড় কিছু করার জন্য সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।"
সরকারী গৈলা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জহিরুল হক বলেন, "সুজন ও প্রিতম আমার বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ছিল। তারা আমাদের গর্ব, তাদের আবিষ্কার বিদ্যালয় ও আগৈলঝাড়া উপজেলার সুনাম বয়ে এনেছে। আমরা তাদের দুজনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।"
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খোরশেদ আলম মন্তব্য করেন, "তারা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আগামী দিনের কথা চিন্তা করে মেধাবী ছাত্রদের এ উদ্ভাবন আমাদের দেশের কাজে লাগাতে হবে।"
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আইটি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আমির সোহেল বলেন, "আমাদের ছাত্র প্রিতম একটি রকেট ও মিসাইল প্রজেক্ট নিয়ে থান্ডারবোল্ড মিসাইল এবং রকেট তৈরি করছে। প্রিতম সবসময়ই নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রতি পরিশ্রমী ও কৌতূহলী। তাকে আমরা ল্যাব সুবিধার মাধ্যমে সহযোগিতা করে আসছি। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, এমন মেধাবী শিক্ষার্থীদের আরও সুযোগ ও সহায়তা দেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে দেশের জন্য বড় অবদান রাখতে পারে।"
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
প্রিতম পালের মতে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মাথায় রেখেই তারা এই আবিষ্কার করেছেন। সরকারের সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার তাদের ইচ্ছা রয়েছে। এই মামা-ভাগ্নের যৌথ প্রচেষ্টা শুধু বরিশাল নয়, সমগ্র দেশের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ হয়ে থাকবে, যা তরুণ প্রজন্মকে উদ্ভাবন ও দেশসেবায় উৎসাহিত করবে।



