যন্ত্রটির নিজস্ব কোনো মন বা মস্তিষ্ক নেই। অন্তত আমাদের মতো তো নয়ই। তবু সে তার সামনের উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। তার গায়ে বসানো আছে দারুণ সব আধুনিক যন্ত্রপাতি। সেগুলো দিয়ে সে খুব ধৈর্য ধরে তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রতিটি তথ্য যাচাই করে দেখছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে টানা নক্ষত্রটি পর্যবেক্ষণ করার পর মিলল ফলাফল।
নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহ
নক্ষত্রের চারপাশে বেশ কয়েকটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ ঘুরছে। এদের প্রতিটিরই আছে বরফে ঢাকা চাঁদ। সেই বরফের নিচে পানি থাকার সম্ভাবনা প্রবল। শুধু তা-ই নয়, নক্ষত্রটির আছে ছোট তিনটি পাথুরে গ্রহ। এগুলোতেও তরল পানি থাকার সম্ভাবনা আছে। এই তিনটি গ্রহের মধ্যে মাঝেরটিতে প্রাণের একদম স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল। এর বায়ুমণ্ডলে ভেসে বেড়াচ্ছে প্রচুর মুক্ত অক্সিজেন। প্রাণ থাকার সবচেয়ে বড় লক্ষণই এই অক্সিজেন।
যন্ত্রের প্রতিক্রিয়া
যন্ত্রটির যদি কোনো আবেগ বা অনুভূতি থাকত, তবে সে আনন্দে চিৎকার করে উঠত! কিন্তু তার বদলে সে একেবারে নিঃশব্দে নিজের কাজের পরের ধাপের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নভোযানটি সৌরজগতের দিকে তার গতি কমাতে শুরু করেছে। এর আগে সে প্রায় আলোর গতিতে ছুটছিল। প্রায় এক বছর সময় নিয়ে এই গতি কমিয়ে এনেছে। এর মধ্যে সে কয়েকবার নিজের পথও একটু এদিক-ওদিক করে ঠিক করে নিয়েছে। পুরোটা সময় সে খুঁজেছে তার নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু।
লক্ষ্যে পৌঁছানো
অবশেষে সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দেখা পেল। এটি এক মাইলের চেয়েও চওড়া একটি ধাতব গ্রহাণু। নভোযানটি খুব সাবধানে গ্রহাণুটির পাশ দিয়ে উড়ে গেল। আর ঠিক সেই সময়েই সে কয়েক মিটার চওড়া ছোট একটি বাক্স ছুড়ে দিল গ্রহাণুটির দিকে। ওই বাক্সটিও আসলে ছোটখাটো একটা মহাকাশযান। এতে রয়েছে ছোট্ট একটি রকেট ইঞ্জিন। সেই ইঞ্জিন চালু করে সে নিজের গতি আরও কমিয়ে আনল। এরপর খুব সুন্দরভাবে নেমে পড়ল গ্রহাণুটির বুকে। নেমেই সে তার মাদারশিপের কাছে একটি সংকেত পাঠাল—সব ঠিক আছে। কিন্তু মাদারশিপ কোনো উত্তর দিল না। উল্টো সে তার গতি বাড়িয়ে তালিকার পরের নক্ষত্রের দিকে ছুটতে শুরু করেছে। সেই নক্ষত্রে পৌঁছাতে তার হয়তো আরও কয়েক দশক সময় লাগবে।
রোবট মাকড়সার আগমন
এদিকে গ্রহাণুর বুকে নামা ওই ছোট নভোযানটির একটি দরজা খুলে গেছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে ছোট একটি মাকড়সা। তারপর আরও একটি, তারপর আরও একটি। এভাবে মোট বারোটির মতো রোবট মাকড়সা গ্রহাণুটির বুকে হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে। এগুলো ধাতু, সিরামিক এবং কার্বন ফাইবারের এক অদ্ভুত ও আধুনিক মিশ্রণ দিয়ে তৈরি। বের হয়েই তারা কাজে লেগে পড়ল। তারা মাটি খুঁড়তে শুরু করল, ধাতু গলাতে লাগল এবং নতুন জিনিস বানাতে শুরু করল। তাদের কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো আবেগ নেই। দিনরাত একটানা কাজ করে চলল তারা। এভাবে এক মাস কাজ করার পর তারা প্রস্তুত হলো।
ছত্রাকের মতো বিস্তার
ছত্রাক যেভাবে তার রেণু ছড়িয়ে দেয়, ঠিক সেভাবেই গ্রহাণুটির বুকে হাজার হাজার ছোট ছোট বিস্ফোরণ ঘটল। প্রতিটি বিস্ফোরণের ধাক্কায় এক মিটার চওড়া একেকটি ধাতব বল ছিটকে বেরিয়ে এল। বলগুলো আগে থেকে টার্গেট করে রাখা গ্রহ ও চাঁদগুলোর দিকে ছুটতে শুরু করল। প্রতিটি ধাতব বলের ভেতর লুকিয়ে আছে ১০০টির বেশি রোবট মাকড়সা।
প্রোগ্রামিং ও লক্ষ্য
এই যান্ত্রিক মাকড়সাগুলোর প্রোগ্রামিং খুবই আধুনিক। কিন্তু এদের মূল লক্ষ্য খুব সাধারণ; সামনে যা কিছু পাবে তা দিয়েই আরও নতুন মাকড়সা তৈরি করো। পর্যাপ্ত মাকড়সা তৈরি হয়ে গেলে বানাতে হবে আরও বড় মাদারশিপ। সেগুলোকে মহাকাশে ছুড়ে দিয়ে পুরো চক্রটা আবার শুরু করতে হবে। নতুন মাকড়সা বানানোর জন্য তাদের যেকোনো ধরনের ধাতু হলেই চলে। আর যে ধাতু তারা পায় না, সেটা তারা নিজেরা বানিয়ে নিতে পারে। লাখ লাখ বছর ধরে এমন অভিযান চালিয়ে তাদের এই প্রোগ্রামিং আরও নিখুঁত হয়েছে। উপকরণ নিয়ে তাদের কোনো বাছবিচার নেই। চোখের সামনে যা পাবে, তা দিয়েই কাজ চালিয়ে নিতে পারে। প্রতিটি মাকড়সা মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিজের কপি বানানোর সব যন্ত্রপাতি তৈরি করে ফেলতে পারে। এরপর সেই নতুন কপিগুলোও নিজেদের আরও কপি বানাতে শুরু করে। একবার কোনো গ্রহে এই মাকড়সাগুলো নামতে পারলে, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তারা পুরো গ্রহ দখল করে নিতে পারে। গ্রহের সব কিছু—হ্যাঁ, একেবারে সব কিছু তারা ভেঙে নতুন মাকড়সা ও মহাকাশযানে রূপান্তর করে ফেলে।
মঙ্গল ও পৃথিবীর পতন
গ্রহাণু থেকে দূরত্ব কম এবং আকারে ছোট হওয়ায় সবার আগে ধ্বংস হলো মঙ্গল গ্রহ। মঙ্গলের পাথরগুলোতে প্রচুর লোহা আছে। ফলে মাকড়সাগুলোর কাজ আরও সহজ হয়ে গেল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ লাখ নতুন মাকড়সা কাঁচামালের খোঁজে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের কাছে এই কাঁচামালই হলো খাবার। কয়েক দিনের মধ্যেই পৃথিবীর পতন হলো। প্রথম মাকড়সাগুলো নামল অস্ট্রেলিয়ায়। চোখের সামনে যা পেল, তা-ই তারা গিলে খেতে শুরু করল। পাথর, ধাতু, গ্যাস এমনকি প্রয়োজন হলে সব কিছুকেই তারা কাজে লাগাতে পারে। পানি, গাছপালা, এমনকি রক্তমাংসের প্রাণীও তাদের খাবার হতে পারে। মানুষের বাঁচার কোনো সুযোগই ছিল না।
প্রতিরোধের অক্ষমতা
যদিও পৃথিবীর শক্তিশালী টেলিস্কোপগুলো কয়েক মাস ধরেই মহাকাশ থেকে আসা ওই মাদারশিপের তীব্র আলোর ওপর নজর রাখছিল। কিন্তু সেখান থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। মাকড়সাগুলো যখন পৃথিবীতে নামল, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কোনো দেশের সরকারের কাছেই বাধা দেওয়ার মতো সময় ছিল না। মাকড়সাগুলো পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে পৃথিবীতে আর কোনো প্রাণের অস্তিত্ব রইল না। পুরো পৃথিবীটাই পরিণত হলো বিশাল এক রোবট কারখানায়। এক বছরের মধ্যে পৃথিবীর আকাশজুড়ে আলোর ঝলকানি দেখা গেল। হাজার হাজার নতুন মাদারশিপ মহাকাশে উড়াল দিল। এদের প্রতিটিই সেই প্রথম মাদারশিপের হুবহু কপি। আর সেই প্রথম মাদারশিপটিও হয়তো কোটি কোটি বছর আগে বানানো অন্য কোনো মাদারশিপের কপি ছিল। সেই আদি মাদারশিপটি হয়তো অনেক আগেই মারা গেছে, কারণ তার ভেতরের সব বাক্স ফুরিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তার বংশধরেরা বেঁচে আছে এবং পুরো গ্যালাক্সিতে তারা ছড়িয়ে পড়ছে।
মানবজাতির পরিণতি
আর এখন, এমন আরও কয়েক হাজার মাদারশিপ গভীর মহাকাশের দিকে ছুটছে। এই অভিযান যখন প্রথম শুরু হয়েছিল, পৃথিবীতে তখন মানুষের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আদিম মানুষের পূর্বপুরুষেরা হয়তো তখন কেবল আফ্রিকার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। তাদের বংশধরেরাই একদিন পুরো পৃথিবী শাসন করেছিল। কিন্তু তাদের সেই রাজত্ব ছিল খুব সামান্য সময়ের জন্য। পৃথিবীর সেই কোটি কোটি মানুষ এখন আর নেই। তারা সবাই এখন পরিণত হয়েছে অগণিত ছোট ছোট ধাতব মাকড়সা ও মহাকাশযানে। তাদের দিয়ে তৈরি হওয়া সেই মহাকাশযানগুলো ছুটছে দূরের নক্ষত্রদের দিকে। মানুষের নক্ষত্র ছোঁয়ার স্বপ্ন এভাবেই একদিন পূরণ হলো; তবে ঠিক সেভাবে নয়, যেভাবে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিল। চলবে…
ফিলিপ প্লেইট, ডেথ ফ্রম দ্য স্কাইজ!: দ্য সায়েন্স বিহাইন্ড দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অবলম্বনে
টীকা
১. বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সৌরজগতের বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপা এবং শনির চাঁদ এনসেলাডাসে তরল পানির বিশাল মহাসাগর লুকিয়ে আছে। যদিও বিষয়টা এখনো মনে করা পর্যন্তই! তবে শিগগিরিই এই বিষয়ের প্রমাণ মিলতে পারে। ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিল উৎক্ষেপণ করা হয়েছে ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির জুস মিশন। এর মূল লক্ষ্য বৃহস্পতি এবং তার তিনটি বিশাল বরফঢাকা চাঁদ গবেষণা করা। চাঁদগুলো হলো গ্যানিমিড, ক্যালিস্টো এবং ইউরোপা। সেখানে প্রাণ ধারণের উপযোগী পরিবেশ আছে কি না, তা-ই যাচাই করা হবে এই মিশনে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নাসা বৃহস্পতির চাঁদ ইউরোপার উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছে ইউরোপা ক্লিপার মিশন। এই মিশনে ইউরোপার ওপর দিয়ে প্রায় ৫০ বার নভোযান উড়ে যাবে এবং এর বরফের পুরুত্ব ও নিচের পানির লবণাক্ততা পরিমাপ করবে। ২০৩০ সালের এপ্রিলে এটি বৃহস্পতির কাছে পৌঁছাবে। পাশাপাশি ২০২৮ সালে শনির চাঁদ টাইটানের উদ্দেশ্যে পাঠানো হবে নাসার ড্রাগনফ্লাই মিশন। এই মিশনে পরীক্ষা করা হবে, টাইটানে প্রাণের রাসায়নিক উপাদানগুলো আছে কি না। সুতরাং, এখন যা বিজ্ঞানীরা ‘মনে করছেন’, আগামী দশকে তা হয়তো বাস্তবে পরিণত হবে।
২. বর্তমানে জেমস ওয়েবের মতো অত্যাধুনিক টেলিস্কোপ দিয়ে বিজ্ঞানীরা দূরের মহাকাশে নজর রাখছেন ঠিকই। কিন্তু ভিনগ্রহীদের এমন আক্রমণ ঠেকানোর মতো কোনো প্রস্তুতি বা প্রযুক্তি এখনো মানুষের হাতে নেই।



