বজ্রপাতের বিজ্ঞান: কীভাবে তৈরি হয় এই মহাজাগতিক শক্তি?
বজ্রপাতের বিজ্ঞান: কীভাবে তৈরি হয় এই মহাজাগতিক শক্তি?

আকাশের বিশাল নীল রাজ্যের মেঘের ভেতরে চলে অদৃশ্য যুদ্ধ। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, মেঘের ভেতরে বরফকণা, শিলাখণ্ড ও পানির ফোঁটার সংঘর্ষে বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি হয়। মেঘের ওপরের অংশে ধনাত্মক ও নিচের অংশে ঋণাত্মক চার্জ জমা হয়। চার্জের পার্থক্য বেড়ে গেলে বায়ুর নিরোধক ক্ষমতা ভেঙে পড়ে এবং বৈদ্যুতিক পথ সৃষ্টি হয়। সেই পথ ধরে বিপুল স্রোত নেমে আসে সাদা-নীল আলোর ঝলক হয়ে—এটাই বজ্রপাত।

বজ্রপাতের তাপমাত্রা ও আলোর উৎস

বজ্রপাতের সময় বিদ্যুতের স্রোত যে সরু পথ দিয়ে যায়, তার তাপমাত্রা প্রায় ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়—সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার প্রায় পাঁচ গুণ। এই তাপে বাতাসের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন অণু ভেঙে প্লাজমায় পরিণত হয়, যা থেকে সৃষ্টি হয় চোখ ধাঁধানো সাদা, নীলাভ বা বেগুনি আলো।

আলো আগে, শব্দ পরে কেন?

আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার, কিন্তু শব্দের গতি মাত্র ৩৪৩ মিটার। আলো শব্দের চেয়ে প্রায় ৮ লাখ ৭৪ হাজার গুণ দ্রুত চলে। তাই বজ্রপাতের আলো দেখার কয়েক সেকেন্ড পর আমরা বজ্রধ্বনি শুনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বজ্রপাতের রাসায়নিক রহস্য

বজ্রপাতের প্রচণ্ড তাপে বাতাসের নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন বিক্রিয়া করে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি করে। এরপর তা বাতাসের অক্সিজেনের সাথে মিশে নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডে পরিণত হয়। নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড বৃষ্টির পানির সাথে মিশে নাইট্রিক অ্যাসিড তৈরি করে, যা মাটিতে মিশে উদ্ভিদের জন্য নাইট্রেট সরবরাহ করে। অর্থাৎ বজ্রপাত প্রকৃতির এক বিশাল প্রাকৃতিক সার কারখানা।

ইলেকট্রনিক প্রভাব ও মানব-চুম্বকের গুজব

একটি শক্তিশালী বজ্রপাতে কয়েক হাজার থেকে এক লাখ অ্যাম্পিয়ার কারেন্ট প্রবাহিত হতে পারে, যা তীব্র বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই তরঙ্গ আশপাশের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি যেমন মোবাইল টাওয়ার, বিদ্যুতের লাইন বা কম্পিউটার নষ্ট করে দিতে পারে। তাই উঁচু ভবনে লাইটনিং অ্যারেস্টার ব্যবহার করা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রচলিত আছে বজ্রপাতে মারা গেলে মানুষ চুম্বক হয়ে যায়, কিন্তু এটি গুজব মাত্র। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। প্রতারক চক্র কখনো কখনো এই গুজব ব্যবহার করে মানুষকে ঠকানোর চেষ্টা করে।

অমীমাংসিত রহস্য: বল লাইটনিং ও গামা রশ্মি

বজ্রপাতের পর কখনো কখনো আকাশে বা মাটির কাছে জ্বলন্ত গোলকের মতো আলো ভেসে বেড়ায়, যাকে বলে বল লাইটনিং। এটি কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয় এবং হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যায়। এর প্রকৃত কারণ এখনও জানা যায়নি।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, বজ্রপাতের সময় মাঝেমধ্যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে মহাকাশের দিকে অত্যন্ত শক্তিশালী গামা রশ্মি নির্গত হয়, যার নাম টেরেস্ট্রিয়াল গামা-রে ফ্ল্যাশ। কীভাবে পৃথিবীর আকাশ এত শক্তিশালী বিকিরণ তৈরি করে, তা এখনও গবেষণার বিষয়।

মহাজাগতিক শক্তির খোঁজে

১৭৫২ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন তাঁর ঘুড়ি পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন বজ্রমেঘে বৈদ্যুতিক চার্জ জমা থাকে। নিকোলা টেসলা ধারণা করেছিলেন পৃথিবী নিজেই একটি বিশাল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, যার শক্তি একদিন তারহীনভাবে সংগ্রহ ও পরিবহন করা যাবে। আজও বিজ্ঞানীরা বজ্রপাতের প্রতিটি ঝলক বিশ্লেষণ করছেন, কারণ এই রহস্য বুঝতে পারলে আবহাওয়া ও মহাকাশের অনেক অজানা ঘটনা বোঝা যাবে।

বজ্রপাত শুধু ভয়ের ঘটনা নয়; এটি পদার্থ, রসায়ন, আবহাওয়া ও মহাকাশবিজ্ঞান গবেষণার অপূর্ব মিলনস্থল। বর্ষার অন্ধকার আকাশে বিদ্যুতের সাদা রেখা যখন আঁকা হয়, তখন মনে হয় প্রকৃতি নিজেই তার গোপন গবেষণাগারের দরজা খুলে দিয়েছে।