টিউশনির টাকায় ল্যাপটপ কিনে ফ্রিল্যান্সিংয়ে কোটি টাকা আয় করলেন সাইফুর
টিউশনির টাকায় ল্যাপটপ কিনে ফ্রিল্যান্সিংয়ে কোটি টাকা আয়

ফ্রিল্যান্সিংয়ে সাফল্যের গল্প

২০২১ সালের শেষ দিকে টিউশনির জমানো টাকায় প্রথম ল্যাপটপ কেনার সময় চোখে জল এসেছিল সাইফুর রহমানের। সেই ল্যাপটপ শুধু একটি ডিভাইস ছিল না, ছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বপ্ন বাস্তবের হাতিয়ার। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে আসা সাইফুর আজ ২০২৬ সালে একজন সফল ফ্রিল্যান্সার ও উদীয়মান উদ্যোক্তা। গুগল অ্যাডস ও ওয়েব অ্যানালিটিকসে কাজ করে তিনি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস থেকে আয় করেছেন প্রায় এক লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় কোটি টাকার বেশি।

শিক্ষাজীবন ও চাকরির বাজারে ব্যর্থতা

আবদুল লতিফ ও শিপা খানম দম্পতির ছেলে সাইফুর ২০০৮ সালে বরমচাল প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক, ২০১৪ সালে বরমচাল উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে ইউসুফ গণি আদর্শ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ২০২২ সালে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেন তিনি। বিবিএ শেষে চাকরির বাজারে নামলেও তীব্র প্রতিযোগিতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে বারবার ব্যর্থ হন। একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়েও সুসংবাদ না পাওয়ায় হতাশায় ডুবে যাচ্ছিলেন। তবে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টার চাকরি তাঁর স্বপ্নকে আটকে দেবে না।

স্কিলআপার ও ল্যাপটপ কেনা

বিবিএ পড়ার সময় ২০২১ সালের শেষে সাইফুর আইটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ‘স্কিলআপার’-এর সন্ধান পান, যেখানে গুগল অ্যাডস, ডিজিটাল মার্কেটিং ও ওয়েব অ্যানালিটিকসের কোর্স করানো হতো। ল্যাপটপ না থাকায় টিউশনি করে টাকা জমিয়ে ল্যাপটপ কেনেন। সাইফুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্কিলআপারের অধীনে গুগল অ্যাডস এবং পরবর্তী সময় ওয়েব অ্যানালিটিকস কোর্সে ভর্তি হই। শুরু হয় কঠোর পরিশ্রমের অধ্যায়। কোর্সের ক্লাসগুলো ছিল দারুণ প্র্যাকটিক্যাল। সত্যিকারের প্রকল্পের মাধ্যমে কীভাবে জিএ–৪ দিয়ে ডেটা অ্যানালাইসিস করতে হয়, কনভার্শন ট্র্যাক করতে হয়—সব শিখছিলাম। দিন–রাত এক করে ফেলতাম। রাত জেগে কাজ শিখতাম, দিনে ঘুমাতাম। কারণ, আমি জানতাম, এটাই আমার শেষ সুযোগ।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম আয় ৮ ডলার

কোর্স শেষে আপওয়ার্কে অ্যাকাউন্ট খোলেন সাইফুর। প্রথম দিকে প্রপোজাল পাঠিয়েও কোনো সাড়া মিলছিল না। অবশেষে প্রথম কাজ পান মাত্র আট ডলার প্রতি ঘণ্টা সম্মানীতে। ছোট কাজ হলেও সেদিন আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করায় সেই গ্রাহকই পরে ২৫ ডলার হারে ৮০০ ডলারের প্রকল্প দেন। মাত্র চার মাসের মধ্যে আপওয়ার্কে ‘টপ রেটেড’ ফ্রিল্যান্সারের স্বীকৃতি পান সাইফুর।

এমবিএ ও বর্তমান জীবন

ফ্রিল্যান্সিংয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনা থামাননি সাইফুর। ২০২৫ সালে সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। আজ তাঁর টেবিলে ম্যাকবুক, পকেটে আইফোন ১৫ প্রো ম্যাক্স, আর নিজের বাইক। ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয় দিয়ে নিজের ও দুই বোনের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারকে উপহার দিয়েছেন নতুন বাড়ি। সাইফুরের মা গর্ব করে বলেন, ‘তোর জন্য আমরা অনেক কষ্ট করেছি, কিন্তু আজ আমরা গর্বিত।’ সাইফুর বলেন, ‘মায়ের মুখের হাসিই আমার কাছে বড় রেমিট্যান্স।’

এজেন্সি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বর্তমানে সিলেটের শিবগঞ্জে থাকা সাইফুর নিজের একটি ছোট এজেন্সি গড়ে তুলেছেন, যেখানে আরও দুই তরুণ তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন। তিনি তাঁদের দক্ষ করে তুলছেন। ভবিষ্যতে এজেন্সি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখেন সাইফুর। তিনি বিশ্বাস করেন, ‘আমাদের দেশে দক্ষ মানুষের অভাব নেই, অভাব শুধু সঠিক দিকনির্দেশনার। একটি ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিয়ে নেমে পড়া উচিত। সাফল্য একদিন আসবেই।’