ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা জোরদার
ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা

ঈদ উল ফিতরে সৌহার্দ্য পরিবহনের দুর্ঘটনায় কবলিত হওয়ার কথা নিশ্চয়ই এখনও সবার স্মৃতিতে ভাসে। একসঙ্গে ২৬টি লাশ। সেই সময় রাজবাড়ীর নয় বছরের আমেনার খবর অনেকেই পত্র-পত্রিকায় পড়েছেন। বাবার কবরের মাটি নিয়ে ঘুমাতো আমেনা। এই খবর সবার চোখে অশ্রু এনেছিল। ঈদ যাত্রায় যাওয়া-আসার পথে এমন মৃত্যুর মিছিল ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ স্মৃতি তৈরি করে। ঈদ এলেই শত শত মানুষ সড়কে প্রাণ দেয়। কত প্রিয়জন তার স্বজন, আত্মীয়-পরিজনের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। ঠিক সেই অপেক্ষার শেষ যদি হয় কেবল অশ্রু আর বুকফাটা আর্তনাদ দিয়ে তাহলে তা মেনে নিতে কার না কষ্ট হয়। আবার ঈদের আনন্দ কাটিয়ে যখন মানুষ কর্মমুখী হওয়ার জন্য ফিরতে শুরু করে। মুহূর্তে মৃত্যুর খবর সেই আনন্দকে কোথায় যেন হারিয়ে দেয়। যে মানুষটি এই দুদিন আগে ঈদে এত এত আনন্দ করে গেলো। আজ সে নির্বাক লাশ। ঈদ যাত্রায় যারা সড়কে প্রাণ হারান তাদের স্বজনরা সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়ান আজীবন। ঈদ এলেই আমেনাদের চোখের অশ্রু যেমন তার বাবাকে খুঁজবে তেমনই জীবনের সব কটা ঈদ ভরে থাকবে বিষাদে।

গত ঈদুল ফিতরের ছুটিতে প্রায় সাড়ে তিনশ মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এবার ঈদ যাত্রার এমন প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে পথে পথে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি কঠোর আইন প্রয়োগ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত না হলে ঈদযাত্রার দুর্ঘটনা পুরোপুরি কমানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার চিত্র

চলতি ঈদযাত্রায় মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৮৮ জন আহত হন। এর মধ্যে সড়কেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে সদরঘাট, কুমিল্লা ও দৌলতদিয়ায় বড় দুর্ঘটনা ঘটে। গত ১৮ মার্চ সদরঘাটে লঞ্চ সংঘর্ষে ২ জন, ২২ মার্চ কুমিল্লায় বাস-ট্রেন সংঘর্ষে ১২ জন এবং ২৬ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নদীতে পড়ে ২৬ জন নিহত হন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানি রোধে করণীয় কী— জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “বিশ্বের অনেক দেশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্ঘটনা কমিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে আছে।” তার মতে, “রোড ডিভাইডার না থাকা, ফিটনেস যাচাইয়ে প্রযুক্তির অভাব এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। উন্নত বিশ্বের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করলেই দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”

সরকারের বক্তব্য

জাতীয় সংসদে ঈদযাত্রা ও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, “ঈদের সময় যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায় এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে কিছু ফিটনেসবিহীন যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করে, যার কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে।” তিনি জানান, এসব সমস্যা সমাধানে সরকার সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

মন্ত্রী আরও জানান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) প্রধান কার্যালয়ে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এই নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সিসিটিভি ও অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে মহাসড়কের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দুর্ঘটনা বা যানজট দেখা দিলে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা যায় এবং আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।

সরকারি উদ্যোগ

বিআরটিএ জানায়, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, হাইওয়ে পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ও টার্মিনালগুলোতে সিসিটিভি ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কোথাও যানজট বা দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ফিটনেসবিহীন ও অননুমোদিত যানবাহনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট ও বিশেষ টিমের মাধ্যমে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ঈদের সময় এসব যান চলাচল বন্ধ রাখতে হাইওয়ে পুলিশ ও বিশেষ টিম মাঠে কাজ করছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত জনবল মোতায়েন করা হয়েছে এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় বিশেষ টহল জোরদার করা হয়েছে।

টোল প্লাজাগুলোতে যানবাহনের চাপ কমাতে অতিরিক্ত বুথ চালু এবং দ্রুত টোল আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছু গুরুত্বপূর্ণ রুটে ভারী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ফেরিঘাট ও নৌপথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ফেরিঘাট ও নৌপথ দুর্ঘটনা রোধে একাধিক নির্দেশনা জারি করেছে। এতে বলা হয়েছে, ফেরিতে অতিরিক্ত যাত্রী ও যানবাহন বহন করা যাবে না এবং যাত্রীসহ গাড়ি আগে নামিয়ে তারপর ফেরিতে ওঠানো হবে। ফিটনেসবিহীন ও অনিরাপদ নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। রাতে স্পিডবোট চলাচল নিষিদ্ধ এবং দিনে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ছোট নৌযান ঈদের সময় সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে এবং নির্ধারিত ঘাট ছাড়া যাত্রী ওঠানামা করা যাবে না।

বাসে নিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমন নির্দেশনা

বিআরটিএ এসি বাসে জরুরি বহির্গমন পথ (ইমার্জেন্সি ডোর) নিশ্চিত এবং নন-এসি বাসের জানালায় থাকা স্টেইনলেস স্টিলের রড অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে। দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের দ্রুত বের হতে না পারার সমস্যা কমাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে এসি বাসে ইমার্জেন্সি ডোর চিহ্ন স্পষ্ট রাখা এবং জানালার গ্লাস ভাঙার উপকরণ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নন-এসি বাসের জানালার মাঝের রড অপসারণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

জিপিএস ব্যবহারের উদ্যোগ

গণপরিবহনে গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২৯ মার্চ সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী একথা জানান। এর মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।