সাইবার সুরক্ষা আইনে কনটেন্ট অপসারণসহ বড় পরিবর্তন আসছে
সাইবার সুরক্ষা আইনে কনটেন্ট অপসারণসহ বড় পরিবর্তন

সামাজিক মাধ্যমসহ সাইবার স্পেসে গুজব, মানহানিকর ও ভুয়া কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ভিডিও, অডিও ও ছবি তৈরি ঠেকাতে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি সরকার।

সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তাররোধে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোকে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করার বিধানও আইনে আনা হবে।

সংসদে প্রশ্ন ও জবাব

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খানের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ তথ্য জানান। হেলেন জেরিন খান সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া আইডি, বট নেটওয়ার্ক, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট, নারী ও শিশুদের অনলাইনে হয়রানি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিষয়টি সংসদে তুলে ধরেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি বলেন, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে ভুয়া পরিচয়ে অসংখ্য অ্যাকাউন্ট ও পেজ পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিও তৈরি করে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সরকারের প্রধান, তার স্ত্রী ও কন্যা, মন্ত্রীর স্ত্রী ও কন্যাসহ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অথবা প্রতিপক্ষ বিবেচনায় কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার নামে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে যেসব কনটেন্ট প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা আসলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিনা, তা পুনরায় সংজ্ঞায়িত করা দরকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সামাজিক মাধ্যম, ভার্চুয়াল মিডিয়া এবং অনলাইনভিত্তিক সব প্ল্যাটফর্মকে অন্তর্ভুক্ত করে 'সাইবার স্পেস'-এর নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। সংশোধিত আইনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার প্রতিরোধে নতুন শাস্তির বিধান সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এআই কনটেন্ট ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে অপমানজনক, বিরক্তিকর ও মানহানিকর কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আরো কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করার জন্য নতুন বিধান আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং সামাজিক মাধ্যম, ভার্চুয়াল মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোকে আইনের আওতায় আনা হবে।

কনটেন্ট অপসারণের বর্তমান অবস্থা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, আগের সাইবার সুরক্ষা আইন পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইনে পরিণত হলেও বর্তমান আইনে ভুয়া তথ্য, মানহানিকর কনটেন্ট ও ছবি তৈরি করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করলেও তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সাইবার সিকিউরিটি বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, বর্তমান আইনে ভুয়া ও মানহানিকর কনটেন্টের অভিযোগ এলে আমরা বিটিআরসিতে লিখি। তবে মেটার সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা চুক্তি না থাকায় তারা খুব একটা সাড়া দেয় না, ফলে কনটেন্ট সরানো যায় না।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, সেক্সটর্শন বা জঙ্গিবাদের মতো বিষয়ে মেটা কনটেন্ট অপসারণে গুরুত্ব দেয়, কিন্তু অন্যান্য কনটেন্টে সাড়া পাওয়া যায় না। তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও মেটার সঙ্গে চুক্তি সম্ভব হয়নি, কারণ নির্বাচিত সরকার ছিল না।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেটার সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স ট্রিটি (এমল্যাট) চুক্তি থাকলে কনটেন্ট অপসারণ ও তথ্য সরবরাহ সম্ভব। তবে রাজনৈতিক কনটেন্ট সরানোর ব্যাপারে মেটা নীতিমালা অনুযায়ী রাজি নাও হতে পারে।

রাজনৈতিক ব্যবহারের আশঙ্কা

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি দল ও বিরোধীদল উভয়ই সামাজিক মাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার চালাচ্ছে। এগুলো জবাবদিহিতার আওতায় আনতে আইন সংশোধন প্রয়োজন, তবে এর রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইন্সটিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেন বলেন, অনেক সময় বিরোধী মত দমানোর জন্য এই ধরনের আইন করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়, যা ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে। তাই রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং সামাজিক মাধ্যমগুলোকে ব্যবহারকারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।