সস্প্রতি ঢাকায় মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের অনেকগুলো কথার একটি কথা কানে বেজেছিল। তিনি বললেন, ‘সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার হু ডোমিনেট দ্য মিডিয়া ল্যান্ডস্কেপ অব বাংলাদেশ থ্রিভ অন লাইস’।
ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের এই মন্তব্য চিন্তার সুযোগ তৈরি করে। আজকের ডিজিটাল পৃথিবীতে তথ্যের গতি ও প্রাপ্যতা যখন এত বেশি, তখন সত্যকে বাঁচানোও ততটাই জটিল।
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে খবরের প্রধান উৎস। কিন্তু সেই একই প্ল্যাটফর্মগুলোই এখন মিথ্যার বৃহৎ শিল্প-গড়ে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ডিপফেক ও সিনথেটিক মিডিয়া নতুন শক্তি যুগিয়েছে।
আগে ভুল খবর সাধারণত কোটেশন-চুরি, ছবি-কাটছাঁট বা প্রাসঙ্গিকতা ছাড়া তথ্য উপস্থাপনার মতো সরল কৌশলে ছড়িয়ে পড়তো। আজ আর সেই হাল না। কঠিন প্রযুক্তি এখন নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। কেবল আইটি বিশেষজ্ঞরাই নয়, সাধারণ ব্যবহারকারীও সহজে বাস্তবসম্মত ভিডিও, অডিও বা ছবি তৈরি করে ফেলছে, যা চোখে-কানেই বিশ্বাস জন্মায়। বিশেষত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সিভিল সোসাইটি নেতা ও সেলিব্রেটিদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর বা অনৈতিক কন্টেন্ট তৈরি করে তাদের সম্মান হরণ ও জনমন প্রভাবিত করা হচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত আঘাত নয়, সমাজে নারীর অংশগ্রহণকে বাধিত করার সুপরিকল্পিত আক্রমণও বটে।
বিগত কয়েক বছরে দেখা গেছে ভাইরাল মিথ্যার অধিকাংশ উৎসই সামাজিক মাধ্যম, ফেসবুক সবচেয়ে বেশি। আছে ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্স ও টিকটক। এই প্ল্যাটফর্মগুলো সংবাদ উৎস হলেও এদের বিরুদ্ধে কোনও কার্যকরি মান যাচাই বা দ্রুত প্রতিক্রিয়ার যন্ত্রণা সাধারণত অনুপস্থিত থাকে। ফলে ভুল তথ্য প্রচারিত হলে তা অচিরেই গৃহীত সত্যে পরিণত হতে পারে। ফ্যাক্ট-চেকারের সময়মতো সংশোধন করলেই অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিটা প্রতিরোধ করা যায় না।
ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলো আধুনিক টুলস যেমন ইনভিডি, ডিপওয়্যার ও রিভার্স ইমেজ সার্চ ব্যবহার করলেও সীমাবদ্ধতা অপ্রতিরোধ্য। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় এই প্রযুক্তি যথাযথ কাজ করছে না। অধিকাংশ অ্যালগরিদম ইংরেজিভিত্তিক ডেটা ব্যবহার করে প্রশিক্ষিত, ফলে বাংলা ভাষার সূক্ষ্মতা, আঞ্চলিক রূপ, ব্যঙ্গ বা সাংস্কৃতিক ইঙ্গিতগুলো অনেকে ধরতে ব্যর্থ হয়। আরও গুরুতর হলো অডিওভিত্তিক মিথ্যার যাচাই-অডিওতে ভিজুয়াল ক্লু নেই। কৃত্রিমভাবে গঠন করা কণ্ঠ দ্রুত ছড়িয়ে জনপ্রিয়তা পেলে সত্যকে পুনরুদ্ধার করা অনিবার্যভাবে কঠিন।
ম্যানুয়াল বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীলতার ফলে ফ্যাক্ট-চেকিং ধীর ও ব্যয়বহুল হচ্ছে। ফ্যাক্ট চেকাররাও রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। দেশে মিডিয়া সাক্ষরতার স্তরও কম। অনেক মানুষ সোশ্যাল পোস্টকে যাচাই না করেই গ্রহণ করে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও পেছনের অঞ্চলে যেখানে সমালোচনামূলক চিন্তা ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও সময়োপযোগী পাঠ্যক্রম চালু করে উঠতে বিলম্ব করছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কর্মশালা করলেও ব্যাপক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা নেই। ফলে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা ডিজিটাল টকসইতার প্রশিক্ষণ ছাড়া বেরোচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে নীতি-নিয়ম ও আইনি কাঠামোর আধুনিকায়ন একান্ত প্রয়োজন। কার্যকর ডেটা সুরক্ষা আইন, অ্যালগোরিদমিক স্বচ্ছতা ও স্বাধীন তদারকির অভাবের দুর্বলতাকে প্রতিপক্ষ প্রয়োগ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসিদ্ধি বা নাগরিকদের নির্যাতন জন্মাতে পারে। তাই নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে অবশ্যই মানবাধিকার ও অভিব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা করে এমনভাবে গঠন করতে হবে। পাশাপাশি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোর চলমান কনটেন্ট মডারেশন ও স্বচালিত ফিল্টার ব্যবস্থায় স্থানীয় ভাষা ও সাংস্কৃতিক সূক্ষ্মতা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করছে বাস্তবতা।
প্রতিরোধের পথ এক হতে পারে না, অবশ্যই তা বহুমাত্রিক। জনসাধারণকে ডিজিটাল মিডিয়া সাক্ষরতা শেখানো, বিশেষত গ্রামীণ স্তরে প্রচার কার্যক্রম চালানো জরুরি। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মিথ্যা চিহ্নিতকরণ, এথিক্স ও ডিপফেক সম্পর্কে ধারাবাহিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সাংবাদিকদের জন্য ত্বরিত প্রশিক্ষণ ও অ্যানালিটিকাল টুলসের অ্যাক্সেস বাড়াতে হবে, যেন তারা দ্রুত এবং সফলভাবে ভুল তথ্য চ্যালেঞ্জ করতে পারে। ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় ভাষায় সক্ষম এআই সমাধান তৈরিতে সহায়তা করতে হবে, স্থানীয় ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষিত সিস্টেম ভিন্ন রকমের ছলনা ধরতে পারবে।
কঠোর আইন সহযোগে সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বচ্ছতার দাবি তুলতে হবে। কীভাবে অ্যালগরিদম কনটেন্ট অগ্রাধিকার দেয়, কীভাবে বিজ্ঞাপন টার্গেটিং কাজ করে এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মের দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা কেমন থাকবে- এসব জানতে নাগরিক ও নীতি প্রণেতাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই নৈতিক দিক থেকেও হওয়া উচিত; কুলাঙ্গার কনটেন্ট তৈরির জন্য অর্থায়ন, রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত অনুঘটকদের নির্ধারণ করে দায়ী করা যেতে পারে।
ডিপফেক ও সিনথেটিক মিডিয়া নির্দিষ্টভাবে লিঙ্গভিত্তিক আক্রমণকে ত্বরিত করেছে। নারীদের সম্মান হরণ করে তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে সমাজের গণতান্ত্রিক স্বাস্থ্যই দুর্বল হবে। তাই এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে দ্রুত প্রতিকারের পাশাপাশি প্রত্যাহার, মানহানির ক্ষতিপূরণ ও জবাবদিহিতার নিয়ম থাকা জরুরি।
শেষ কথা, মিথ্যাচারকে শুধুমাত্র তথ্যগত ত্রুটি হিসেবে দেখা যাবে না; এটি এখন মানুষের দেখার ও শোনার প্রতি আস্থা প্রাহার করে। বাংলাদেশের মতো দ্রুত ডিজিটালায়িত জাতি যদি সময়মতো অর্থনৈতিক, আইনি ও শিক্ষাগত পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে সংবাদ ও গণমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাসের অবনতি গণতন্ত্রের ভিত্তিক কাঠামোই দুর্বল করবে। এই লড়াইতে প্রযুক্তি, নীতি ও মানবিক শিক্ষা-এই তিনটি স্তম্ভকে সমন্বয়ে এগোতে হবে।



