চামড়া শিল্পের টিকে থাকতে নীতিগত সংস্কার জরুরি
চামড়া শিল্পের টিকে থাকতে নীতিগত সংস্কার জরুরি

দেশের চামড়া শিল্প বর্তমানে অর্থায়ন সংকট, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে অপচয়ের মতো বহুমাত্রিক সমস্যার মুখোমুখি। খাতটিকে টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে নীতিগত সংস্কার, অর্থায়ন সহজীকরণ এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

ওয়েবিনারে বিশেষজ্ঞদের মতামত

শনিবার (৬ জুন) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ কি ফিকে হয়ে আসছে’ শীর্ষক ওয়েবিনারে এসব কথা উঠে আসে। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের অনেক ট্যানারি বর্তমানে তীব্র অর্থসংকটে রয়েছে। রাজধানীর হাজারীবাগে ট্যানারিগুলোর পরিত্যক্ত জমি বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে শিল্প মালিকদের জন্য নতুন অর্থপ্রবাহ তৈরি হতে পারে। তবে জমি বিক্রির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন বিধিনিষেধ এ পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব জটিলতা দূর করার আহ্বান জানান তিনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অবকাঠামোগত সহায়তার অভাব

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পরিবেশ দূষণ কমাতে হাজারীবাগ থেকে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু স্থানান্তরের পর শিল্পকারখানাগুলোকে যে ধরনের অবকাঠামোগত ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল, তা পর্যাপ্তভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখন লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সনদ প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৭ সাল থেকে কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিব্যাম) কার্যকর করতে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক ও চামড়া খাতও এর আওতায় আসতে পারে। ফলে উৎপাদন ও মূল্য সংযোজনের প্রতিটি ধাপে কার্বন নিঃসরণের হিসাব ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পরও আন্তর্জাতিক বাজারে সুবিধা ধরে রাখতে এসব মানদণ্ড অর্জন অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক বাজারে সিনথেটিক লেদারের চাহিদা বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন।

সংগ্রহ ও সংরক্ষণে অপচয়

ওয়েবিনারে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মো. টিপু সুলতান বলেন, কোরবানির ঈদের সময় ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ছাগলের চামড়া এবং ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ গরুর চামড়া সংগ্রহই সম্ভব হয় না। সংগ্রহ করা চামড়ারও প্রায় অর্ধেক বিভিন্ন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হয়ে যায়।

ফুটওয়্যার, লেদার গুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. নাসির খান বলেন, একসময় যে চামড়া আন্তর্জাতিক বাজারে আড়াই থেকে তিন ডলারে বিক্রি হতো, বর্তমানে তার মূল্য নেমে এসেছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ সেন্টে। সরকারের নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণেই খাতটি প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অর্থায়ন সংকট ও ব্যাংক ঋণ

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ জানান, আগে কোরবানির মৌসুমে ট্যানারিগুলো ‘কোরবানি অ্যাডভান্স’ হিসেবে ব্যাংক থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি টাকার ঋণ পেত। তবে ২০১৭ সালে সাভারে স্থানান্তরের পর অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হয়ে পড়ে। বর্তমানে মাত্র ২০ শতাংশ ট্যানারি কোনোমতে সচল রয়েছে। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে চলতি বছর ব্যাংকগুলো মাত্র ৬৫ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, চামড়া খাতের সংকট শুধু অর্থায়নকেন্দ্রিক নয়। আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স, এলডব্লিউজি সনদ অর্জন এবং সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদের পরামর্শ

কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেন, সঠিক সংরক্ষণব্যবস্থা, সময়মতো লবণ প্রয়োগ এবং সংগ্রহ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া নষ্ট হয়। তিনি আগামী এক বছরের মধ্যে চামড়া অপচয়ের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, রফতানিমুখী এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে অর্থায়নের পাশাপাশি পরিবেশগত মানদণ্ড, আন্তর্জাতিক সনদ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।