শেয়ারবাজারে বড় দরপতন: ডিএসইএক্স ২০৯ পয়েন্ট কমে, বাজার মূলধন ১২ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা হ্রাস
শেয়ারবাজারে বড় দরপতন: ডিএসইএক্স ২০৯ পয়েন্ট কমল

শেয়ারবাজারে বড় দরপতন: ডিএসইএক্স সূচক ২০৯ পয়েন্ট কমে, বাজার মূলধন ১২ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা হ্রাস

মঙ্গলবার ঢাকা শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় দরপতন হয়েছে। এদিন লেনদেন হওয়া বেশির ভাগ শেয়ারের দরপতন হওয়ায় সূচকেরও উল্লেখযোগ্য পতন ঘটেছে। বাজার-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বড় দরপতন সত্ত্বেও লেনদেনের পরিমাণ আশাব্যঞ্জক ছিল, যা বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ডিএসইএক্স সূচকের অবস্থান ও পরিসংখ্যান

দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আজ দিন শেষে ২০৯ পয়েন্ট বা পৌনে ৪ শতাংশ কমে নেমে এসেছে ৫ হাজার ৩২৫ পয়েন্টে। এই পতনের ফলে সূচকটি প্রায় এক মাস আগের অবস্থানে ফিরে গেছে। সর্বশেষ গত ৯ ফেব্রুয়ারি ডিএসইএক্স সূচকটি ৫ হাজার ৩১২ পয়েন্টের সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল।

ঢাকার বাজারে এদিন লেনদেন হওয়া ৩৯১ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৪৯টি বা ৮৯ শতাংশের দাম কমেছে। দাম বেড়েছে মাত্র ৩১টি বা ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের, আর ১১টি বা ৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব ও পূর্বের প্রবণতা

গত শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে হামলা চালায়, এরপর পাল্টা হামলা শুরু করে ইরানও। গত কয়েক দিনে এই হামলা-পাল্টা হামলা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট শুরুর পর গত রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইতে বড় দরপতন হয়েছিল, যেদিন ডিএসইএক্স সূচকটি ১৩৮ পয়েন্ট কমে যায়।

এরপর সোমবার সূচক আবার ঘুরে দাঁড়ায়, এদিন ডিএসইএক্স সূচকটি বেড়েছে ৭২ পয়েন্ট। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংকট শুরুর পর তৃতীয় কার্যদিবসে এসে আজ আবারও বড় পতন হয়েছে বাজারে, যা বাজার বিশ্লেষকদের মতে একাধিক কারণের সম্মিলিত ফলাফল।

দরপতনের প্রধান কারণসমূহ

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একাধিক কারণে বাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে:

  • মধ্যপ্রাচ্য সংকট: মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতি আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে—এই শঙ্কা থেকে আতঙ্কগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন।
  • বিএসইসি নিয়োগ নিয়ে গুজব: শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) শীর্ষ পদে পরিবর্তন নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নানা ধরনের আলাপ-আলোচনা চলছে। গতকাল সোমবার বিকেলের পর বাজারে খবর ছড়িয়ে পড়ে বিএসইসিতে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেটি হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া খবরটি ‘গুজব’ ছিল। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বর্তমান চেয়ারম্যানের পদত্যাগ নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হওয়ায় একটি অংশ দরপতন ঘটিয়ে চেয়ারম্যানকে সরাতে সচেষ্ট হয়েছেন বলে অনেকে মনে করছেন।

কোন কোম্পানিগুলো সূচক পতনে ভূমিকা রেখেছে

দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্রোকারেজ হাউস লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে আজ বড় ধরনের দরপতনের পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার। এসব শেয়ারের দরপতনে সূচকটিও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে গেছে।

যেসব কোম্পানি এদিন সূচকের পতনে বড় ভূমিকা রেখেছে, তার মধ্যে রয়েছে:

  1. ব্র্যাক ব্যাংক
  2. ইসলামী ব্যাংক
  3. ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি)
  4. বেক্সিমকো ফার্মা
  5. স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস
  6. পূবালী ব্যাংক
  7. সিটি ব্যাংক
  8. ইস্টার্ন ব্যাংক
  9. প্রাইম ব্যাংক
  10. ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজ

এই ১০ কোম্পানির শেয়ারের সম্মিলিত দরপতনে ঢাকার বাজারের প্রধান সূচকটি কমেছে ৯৩ পয়েন্টের বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সূচক কমেছে ব্র্যাক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও বিএটিবিসির শেয়ারের দরপতনে। এই তিন কোম্পানির দরপতনে ডিএসইএক্স সূচকটি প্রায় ৪৩ পয়েন্ট কমেছে।

ঢাকার বাজারে আজ ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারের দাম সাড়ে ৪ শতাংশ বা প্রায় ৪ টাকা কমেছে। ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম কমেছে ৫ শতাংশ বা ২ টাকা ৩০ পয়সা। আর বহুজাতিক কোম্পানি বিএটিবিসির প্রতিটি শেয়ারের দাম কমেছে ৯ শতাংশ বা ২৪ টাকা।

বাজার মূলধনের হ্রাস ও অন্যান্য তথ্য

ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির দরপতনের বিপরীতে দুর্বল ও মাঝারি মানের কিছু শেয়ারের দাম বেড়েছে। কিন্তু সূচকে এসব শেয়ারের উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব না থাকায় এসব কোম্পানির দরবৃদ্ধি সূচকে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

বাজারে দরপতন এতটাই বেশি ছিল যে একদিনেই ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ১২ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এদিন লেনদেন হওয়া সব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে এই পরিমাণ অর্থের শেয়ারদর হারিয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারের বড় এই দরপতনের যতটা না যৌক্তিক, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক। বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। তবে বাজারে যথেষ্ট ক্রেতা রয়েছে, যা বাজারের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। তাই আশা করা যায়, ক্রেতারা সক্রিয় থাকলে এই দরপতন স্থায়ী হবে না।

ঢাকার বাজারে আজ দিন শেষে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৮৮৫ কোটি টাকা, যা আগের দিনের চেয়ে ১০৫ কোটি টাকা বেশি। এদিন ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ ৫ কোম্পানির তালিকায় ছিল যথাক্রমে সিটি ব্যাংক, রবি আজিয়াটা, ওরিয়ন ইনফিউশন, ব্র্যাক ব্যাংক ও সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট। এই পাঁচ কোম্পানির সম্মিলিত লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬২ কোটি টাকা।