পুঁজিবাজারের দুর্বলতা: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা
পুঁজিবাজারের দুর্বলতা: অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ

পুঁজিবাজারের দুর্বলতা: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা

পুঁজিবাজারকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান আর্থিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে দেশের অর্থনীতির আকার যতটা বেড়েছে, পুঁজিবাজারের গভীরতা, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের কাঠামো এখনো ব্যাংকনির্ভর। যার কারণে আর্থিক ব্যবস্থায় একধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।

সংখ্যাগত বৈষম্য ও কাঠামোগত ঝুঁকি

সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির আকার ছিল ১৯৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তা এখন বেড়ে ৪৬০ থেকে ৪৭০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ব্যাংক খাতের সম্পদের পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন টাকা। ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৪১ ট্রিলিয়ন টাকায়। তার বিপরীতে ২০১৫ সালে শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন ছিল ৩ দশমিক ২৯ ট্রিলিয়ন টাকা। এখন তা বেড়ে প্রায় ৭ দশমিক ১৪ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। ফলে জিডিপির অনুপাতে বাজার মূলধন প্রায় ১২ শতাংশের নিচেই রয়েছে।

এই বৈষম্য কেবল সংখ্যাগত নয়; এ পরিস্থিতির ভেতরে একাধিক কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণ বিতরণের ফলে ব্যাংক খাতে একধরনের চাপ তৈরি হয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কোনো ধরনের চাপ তৈরি হলে তাতে পদ্ধতিগত ঝুঁকিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ঋণশৃঙ্খলা দুর্বল হলে ঋণের অপব্যবহার ও খেলাপির প্রবণতা বেড়ে যায়। শক্তিশালী পুঁজিবাজার না থাকলে বড় করপোরেটদের ওপর সুশাসনের চাপও কম থাকে। তাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাধাগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে পরিবারের সঞ্চয়ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না হয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হয়।

নেতৃত্ব ও নীতির ঘাটতি

পুঁজিবাজারের দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকের ওঠানামা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি, নীতির ধারাবাহিকতা না থাকা ও বাজার চাহিদার সঙ্গে নীতি প্রণয়নের সংযোগহীনতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে পুঁজিবাজারের ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। মূলত কার্যকর একটি পুঁজিবাজার গঠনের শুরুটা হয় সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থেকে। অর্থায়নের একটি অংশকে ধাপে ধাপে পুঁজিবাজারমুখী করা হলে—অর্থাৎ মূলধন বিনিয়োগ, বন্ড, প্রকল্পভিত্তিক ইনস্ট্রুমেন্ট ও ফান্ডের কাঠামো দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহ বাড়লে—আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ কমে এবং অর্থনীতিতে তহবিল সরবরাহের ভিত্তি আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়।

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও সংস্কার

পুঁজিবাজারে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ‘গেমচেঞ্জার’–এর ভূমিকা রাখতে পারে। রিয়েল টাইম লেনদেন তদারকি, অ্যালগরিদমিক অস্বাভাবিকতা বিশ্লেষণ, ইনসাইডার ট্রেডিং বা কারসাজি শনাক্তকরণ এবং ডেটা বিশ্লেষণভিত্তিক প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা চালু হলে বাজারশৃঙ্খলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাকে একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হলে তথ্যপ্রবাহ দ্রুত হয় এবং সবাই একই সময়ে একই মানের তথ্য পায়।

পাশাপাশি নীতিনির্ধারণ ও নীতিপ্রয়োগকে কার্যকরভাবে আলাদা করা গেলে জটিলতা কমে। লাইসেন্সিং, ইস্যু অনুমোদন, বন্ড নিবন্ধন, রাইটস ইস্যু ও করপোরেট অ্যাকশন অনুমোদনের ক্ষেত্রে সময়সীমা নির্ধারিত করা হলে উদ্যোক্তা ও ইস্যুয়াররা তাতে নিজেদের মতো পরিকল্পনা সাজাতে পারে। এর ফলে ‘হবে কি, হবে না’—এ ধরনের অনিশ্চয়তা কমে যায়। এক্সচেঞ্জগুলোকে অধিক কার্যকর ও ক্ষমতায়িত করা হলে তাতে বাজার ব্যবস্থাপনার গতি বৃদ্ধি পায়। তালিকাভুক্তি, করপোরেট সুশাসন পর্যবেক্ষণ, অস্বাভাবিক মূল্য আচরণ বিশ্লেষণ এবং বাজার তদারকি—এসব কাজ ধাপে ধাপে এক্সচেঞ্জের হাতে ন্যস্ত করা হলে তাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা উচ্চ ঝুঁকি ও নীতিগত তদারকিতে বেশি মনোযোগ দিতে পারে।

তালিকাভুক্তি ও করনীতির সমন্বয়

আমাদের পুঁজিবাজারে গুণগত মানের কোম্পানির তালিকাভুক্তি দীর্ঘদিন ধরে কম। অনেক বড় ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারের বাইরে রয়েছে। ফলে শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন, তারল্য সরবরাহ বাড়ছে না। এমনকি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হয়নি। তাই প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও ব্যবস্থার সংস্কার, অনুমোদন সহজ করা, আইপিও শেয়ারের দামের যথাযথ মূল্যায়নকাঠামো তৈরি এবং বড় প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্তিতে বাস্তব প্রণোদনা দিলে বাজারের পরিধি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ডেরিভেটিভ, হেজিং ইনস্ট্রুমেন্টের মতো পণ্যও চালু করতে হবে।

পুঁজিবাজারের জন্য করনীতির সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হতে পারে। যখন ব্যাংক আমানতের সুদ আয়, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাওয়া যায়, তখন পুঁজিবাজার ও বন্ডে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যায়। তাই করকাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন গঠনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সমন্বয় করা দরকার। শেয়ার ধারণকালের ভিত্তিতে কর–সুবিধা, তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে যৌক্তিক সুবিধা, লভ্যাংশ করকাঠামোর সমন্বয়, দ্বৈত করঝুঁকি হ্রাস এবং বন্ড বা মিউচুয়াল ফান্ড আয়ের করহারে সমন্বয় করা হলে তাতে বিনিয়োগ আচরণ ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাবে। করপোরেট বন্ড ইস্যুর ক্ষেত্রে উৎসে কর ও নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক হলে ঋণবাজারের অগ্রগতি দ্রুত হবে।

অবকাঠামো অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

অবকাঠামো অর্থায়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা বাড়ানো হলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহের ভিত্তি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন উদীয়মান বাজারে দেখা গেছে—অপারেশনাল অবকাঠামো সম্পদ ‘মনিটাইজেশন’ করে নতুন প্রকল্পে মূলধন পুনর্বিনিয়োগের জন্য বড় অঙ্কের তহবিল তোলা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবার বা ব্যক্তিসঞ্চয়কে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারে ভালোভাবে যুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তাতে অবকাঠামো অর্থায়নে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। মূল্য নির্ধারণে শৃঙ্খলা আসে এবং নাগরিকেরা উন্নয়ন প্রকল্পের রিটার্নে অংশ নিতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, পুঁজিবাজার উন্নয়ন কেবল শেয়ারদরের ওঠানামা বা ক্ষণস্থায়ী তারল্য বৃদ্ধির প্রকল্প নয়; এটি একটি কাঠামোগত রূপান্তর, যেখানে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, করপোরেট শাসন-মান, নাগরিক সঞ্চয়ের উৎপাদনশীল ব্যবহার, অবকাঠামো অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকি বণ্টন একসূত্রে গাঁথা থাকে। তাই বাজার উন্নয়নে সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবে দৃশ্যমান হলে পুঁজিবাজার ধাপে ধাপে গভীর, স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত হবে। তাতে করপোরেট প্রবৃদ্ধি, পরিবার সঞ্চয় এবং জাতীয় উন্নয়ন একসঙ্গে যুক্ত হবে।