হাতিরঝিলে ওয়াটার ট্যাক্সি সেবা বন্ধের শঙ্কা, জ্বালানি সংকটে অর্ধেক ট্রিপ কমেছে
রাজধানীর হাতিরঝিলে যাতায়াতের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস এখন জ্বালানি সংকটের তীব্র মুখোমুখি। গত এক দশক ধরে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে এই সেবা পেয়ে আসলেও, বর্তমানে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল না পাওয়ায় অর্ধেকের বেশি ট্রিপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এভাবে চলতে থাকলে যেকোনও সময় এই সেবা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সংকটে রেশনিং পদ্ধতি এবং যাত্রীদের ভোগান্তি
ওয়াটার ট্যাক্সি পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তেলের অভাবে এখন ‘রেশনিং’ পদ্ধতি অনুসরণ করে ট্যাক্সি চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে চারটি ট্যাক্সি বিকল হয়ে পড়ে আছে, আর বাকিগুলো শুধু যাত্রীর সংখ্যা দেখে সীমিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সরেজমিন হাতিরঝিলের রামপুরা ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে, আগের তুলনায় ট্যাক্সির ট্রিপ সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে যাত্রীরা টিকিট কেটে দীর্ঘ সময় ধরে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করছেন, যা নিয়মিত যাতায়াতকারীদের জন্য মারাত্মক ভোগান্তির সৃষ্টি করছে।
যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া এবং উদ্বেগ
রামপুরা থেকে নিয়মিত গুলশান যাওয়া যাত্রী আখতার হোসেন বিপ্লব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগে ১০ মিনিট পরপর ট্যাক্সি ছাড়তো, কিন্তু এখন প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে বসে আছি এবং এখনও ছাড়ছে না। এমন ভোগান্তি কখনও পোহাতে হয়নি। এভাবে চললে এই ওয়াটার ট্যাক্সির জনপ্রিয়তা দ্রুত হারাবে।’ সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিলি আক্তার যোগ করেন, ‘অন্যান্য যানবাহনের তুলনায় ওয়াটার ট্যাক্সিতে চলাচল অনেক আরামদায়ক ছিল, কিন্তু এখন ১৫ জন যাত্রী ওঠার পরও ছাড়ে না, আরও যাত্রীর আশায় চালক বসে থাকেন। ট্যাক্সিতে বসেই আধা ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, তবুও ছাড়ে না, যদিও ভাড়া আগের মতোই আছে।’
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
হাতিরঝিল ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিসের জেট ইন-চার্জ মো. জয়নাল আবেদীন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘আগে ১০ মিনিট পর পর বোট ছাড়তে পারতাম এবং ৮-১০ জন যাত্রী হলেই ছাড়া যেত, কিন্তু এখন তেলের সংকটের কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আগে দৈনিক ৩৫০ থেকে ৪০০ লিটার তেল পেতাম, এখন মাত্র ২০০ লিটার পাচ্ছি, এবং রিজার্ভে তেমন তেল নেই। এভাবে বোট চালু রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে।’ ওয়াটার ট্যাক্সি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান করিম গ্রুপের অপারেশনস ম্যানেজার মোরশেদুল আলম বলেন, ‘২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে এই সেবা চালু করা হয়েছিল এবং তখন থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলছিল। কিন্তু এখন তেলের অভাবে আগের মতো স্বাভাবিক নিয়মে চালাতে পারছি না, অর্ধেক ট্রিপ চালাতে পারছি, যা আয়ও কমিয়ে দিয়েছে। আগের মতো ডিজেল সরবরাহ না হলে এই সার্ভিসটি বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
সেবার গুরুত্ব এবং সমাধানের আহ্বান
রামপুরার বাসিন্দা ফেরদৌস আহমেদ, যিনি প্রতিদিন ওয়াটার ট্যাক্সিতে করে গুলশানে অফিসে যান, তিনি বলেন, ‘এটা আমার জন্য অন্যান্য পরিবহনের চেয়ে সুবিধাজনক ছিল, কিন্তু এখন আর আগের মতো স্বাচ্ছন্দ্যে যেতে পারি না, অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হয়। মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে এই সেবা পুনরায় নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু রাখা উচিত।’ এই পরিস্থিতিতে, জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে হাতিরঝিলের এই জনপ্রিয় পরিবহন সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা রাজধানীর যানজট ও যাত্রীদের জন্য একটি বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি করতে পারে।



