মার্কিন শুল্ক নীতিতে অস্থিরতা: বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দুশ্চিন্তা ও সুযোগ
মার্কিন শুল্ক নীতিতে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দুশ্চিন্তা

মার্কিন শুল্ক নীতিতে নতুন অস্থিরতা: বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানিতে নতুন করে শুল্ক জটিলতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। গত শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করার পর ট্রাম্প নতুন আইনে সব দেশের পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন বাজারে পণ্য রপ্তানি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

রপ্তানিকারকদের উদ্বেগ ও আশাবাদ

সাভারের এসেন্সর ফুটওয়্যার অ্যান্ড লেদার প্রোডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এম মুশফিকুর রহমান গতকাল বলেন, ‘গত বছর ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। তখন আমরা নতুন একটি মার্কিন ক্রেতার কাজ পেয়েছি। বর্তমানে আরেকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে। তবে নতুন করে শুল্ক জটিলতায় আবার অনিশ্চয়তা তৈরি হলো।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রতিযোগী সব দেশের শুল্ক যদি একই থাকে, তাহলে বড় কোনো সমস্যা হবে না বলে মনে হয়।

অন্যান্য রপ্তানিকারকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুল্ক নিয়ে নতুন অস্থিরতা অবশ্যই দুশ্চিন্তার। পাল্টা শুল্ক অবৈধ হওয়ায় প্রতিযোগী সব দেশের জন্য সমান সুযোগ তৈরি হবে এবং প্রতিযোগিতা বাড়বে। তারপরও বাংলাদেশের সুযোগ থাকবে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্যদের তুলনায় বাংলাদেশ যাতে পিছিয়ে না যায়, তার জন্য নতুন সরকারকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সরকারের পর্যালোচনা করা উচিত হবে বলেও মনে করেন তাঁরা।

শুল্ক নীতির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা

গত বছরের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুরুতে বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক থাকলেও পরে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়, যাতে পাল্টা শুল্ক কমে ২০ শতাংশে দাঁড়ায়। গত ৭ আগস্ট এই শুল্ক কার্যকর হয়।

পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি করে ৯ ফেব্রুয়ারি। সে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর দেশটির পাল্টা শুল্কের হার কমে হয় ১৯ শতাংশ। কিন্তু গত শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কয়েক ঘণ্টার মাথায় ট্রাম্প নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যা পরদিন বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। নতুন শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি পরিসংখ্যান ও প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৮ কোটি ২৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে গন্তব্য ১৮ শতাংশ বা ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য। এই বাজারে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ৮৭ শতাংশই তৈরি পোশাক। বিদায়ী অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৭৫৫ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক।

পাল্টা শুল্কের প্রস্তাবে শুরুতে বেকায়দায় থাকলেও পরে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছায় বাংলাদেশ। ভিয়েতনামের শুল্ক ছিল ২০ শতাংশ, ভারতের পণ্যে মোট শুল্কহার ৫০ শতাংশ, এবং চীনের শুল্ক আরও বেশি। ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, জুতাসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকে। কিন্তু গত শুক্রবার মার্কিন আদালতের আদেশের পর নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হলো।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও পরামর্শ

নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, শুল্ক নিয়ে নতুন অস্থিরতা তৈরি হলে রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মার্কিন ক্রেতারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কিছুটা হাত গুটিয়ে অপেক্ষা করতে পারেন। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমরা যে চুক্তি করেছি, সেটি পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ, দেশটিকে আমরা প্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ফেলেছি।’

স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, ‘১৯ শতাংশের চেয়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক ভালো। যদিও অনিশ্চয়তা থাকবে, তারপরও ভালোর দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। শুল্ক কমলে মার্কিন ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, তাতে পণ্যের চাহিদা ও রপ্তানি বাড়তে পারে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, মার্কিন বাজারে শুল্কহার প্রতিযোগী দেশগুলোর কাছাকাছি থাকলেই বাংলাদেশের সুযোগ থাকবে।

এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ বলেন, ‘শুল্কহার পরিবর্তন হলে ক্রয়াদেশের প্রভাব পড়ে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে অনেক মার্কিন ক্রেতাই চীন থেকে ক্রয়াদেশের বড় একটা অংশ সরিয়ে আনবে। এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় খরচ বেশি হওয়ায় বাংলাদেশের সুযোগ ভালো।’

কৌশলগত পদক্ষেপের আহ্বান

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান র‍্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আপাতত অনিশ্চয়তা থাকবেই, সেটি মেনে নিয়েই ব্যবসা করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তিকে কীভাবে সামলায় বাংলাদেশ, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকারের উচিত হবে চুক্তির খুঁটিনাটি মূল্যায়ন বা সংসদে আলোচনার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা।’

তিনি পরামর্শ দেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে হইচই না করে কৌশলে বাংলাদেশকে এগোতে হবে। মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ যেসব দেশ চুক্তি করেছে, তারা কিন্তু চুপচাপ আছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়, সেটি নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাজ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।