নিষেধাজ্ঞায় সাতক্ষীরার লক্ষাধিক জেলে অর্থনৈতিক সংকটে
নিষেধাজ্ঞায় সাতক্ষীরার লক্ষাধিক জেলে সংকটে

সমুদ্র এবং সুন্দরবনে মাছ ধরার ওপর চলমান নিষেধাজ্ঞার কারণে সাতক্ষীরার অনিবন্ধিত লক্ষাধিক জেলে ও তাদের পরিবার বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে। সমুদ্রে মাছ ধরা, পরিবহন ও কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকায় এসব জেলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ৪৯ হাজার নিবন্ধিত জেলে সরকারি চাল পেলেও অনিবন্ধিত লক্ষাধিক জেলে কোনও সহায়তা পাচ্ছেন না। আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার চালাতে জেলেরা এনজিও এবং দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

জেলেদের দুর্দশা ও ঋণের বোঝা

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারা বছরই টানাপোড়েন ও বিভিন্ন সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটে তাদের। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেরা দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করেন। নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন খাদ্যাভাব ও ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। জেলার দেড় লক্ষাধিক জেলে পরিবারের চিত্র একই।

নিষেধাজ্ঞার কারণ ও মেয়াদ

মৎস্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ৪৭৫ প্রজাতির মাছের অবাধ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে ১৫ এপ্রিল থেকে আগামী ১১ জুন পর্যন্ত সাগরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে। এই সময়ে সমুদ্রগামী নৌযান দিয়ে যেকোনো প্রজাতির মাছ ধরা দণ্ডনীয় অপরাধ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত জেলের সংখ্যা

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, সাতক্ষীরায় বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার জন। এর মধ্যে ১২ হাজার ৮৮৯ জন গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। তাদের মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে সবচেয়ে বেশি, যার সংখ্যা সাত হাজার ৩৫৫ জন। আশাশুনি উপজেলায় চার হাজার ৫৫৫ জন এবং তালা উপজেলায় ৯৭৯ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের মধ্যে বর্তমানে ১২ হাজার ৮৭৯ জন ভিজিএফ বা খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। মাছ ধরা বন্ধ থাকাকালীন ৫৮ দিনের জন্য নিবন্ধিত জেলেদের জনপ্রতি মোট ৭৭.৩৩ কেজি করে ভিজিএফ চাল দেওয়া হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে জেলে ও ট্রলার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলায় দেড় লক্ষাধিক জেলে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪৯ হাজার নিবন্ধিত জেলে সরকারি সহায়তা পান। বাকিরা কোনও ধরনের সহায়তা পান না। তাদের মধ্যে শ্যামনগরে ৪০ হাজার, আশাশুনিতে ২০ হাজার, তালায় ২০ হাজার, কালিগঞ্জে ১০ হাজার ও অন্যান্য উপজেলায় পাঁচ হাজার করে অনিবন্ধিত জেলে আছেন। বছরের পর বছর লক্ষাধিক জেলে এই পেশায় থেকে কোনও সহায়তা পান না। ফলে নিষেধাজ্ঞার সময়ে তাদের দুঃখ-কষ্টে সংসার চালাতে হয়।

জেলেপাড়াগুলোতে হাহাকার

সরেজমিনে দেখা গেছে, শ্যামনগর, আশাশুনি ও তালার জেলেপাড়াগুলোতে এখন শুধুই হাহাকার। কর্মহীন জেলেদের অলস সময় কাটছে। ঘাটে বাঁধা নৌকার পাহারায় আর চোখেমুখে অনিশ্চয়তার ছাপ।

জেলেদের বক্তব্য

আশাশুনির উপজেলার প্রতাপনগরের শাহজাহান সরদার বলেন, ‘প্রতি বছর প্রায় পাঁচ মাসের জন্য দুবলার চরে অবস্থান করি। মূলত গভীর সমুদ্রের জেলে আমি। উপকূল থেকে প্রায় ৮০-৯০ কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে মাছ শিকার করি। আমাদের জালে ছুরি, লইট্যা, চেলা, ভোল, মেদ, রুপচাঁদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে। তার সবটুকুই চরে এনে শুঁটকি করি। কিন্তু মৌসুম শেষে ধার করে সংসার চালাতে হয়। ঋণ আর দাদনের ওপর চলতে হয়। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে কষ্টে জীবন কাটাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বর্তমানে আমাদের বড় আতঙ্কের নাম জলদস্যু। গত বছরের তুলনায় এই বছর সমুদ্রে ডাকাতি বেড়ে গেছে। এই ডাকাতি নির্মূল করা গেলে আমরা সাধারণ জেলেরা অনেক বেশি নির্ভয়ে এবং সুস্থভাবে কাজ করতে পারতাম। সমুদ্রে এমন কিছু দামি মাছ পাওয়া যায় যার মূল্য অনেক বেশি, যেমন—ভোল মাছ; এক কেজি ভোল মাছ প্রায় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আমাদের সংগৃহীত এসব মাছ চরেই বিক্রি হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, আশাশুনির মহেস্বরকাঠি, মুন্সীগঞ্জ বা কয়রার ব্যবসায়ীরাও এসে আমাদের কাছ থেকে মাছ নিয়ে যান।’

নিষেধাজ্ঞার সময় সরকার থেকে যে চাল দেওয়ার কথা তা না পাওয়ার অভিযোগ করে শাহজাহান সরদার বলেন, ‘যাদের কার্ড আছে তারা সহায়তা পাচ্ছেন। আমি পাই না। বেশিরভাগ সময় সাগরে থাকতে পারি না। বিশেষ করে আবহাওয়া যখন খারাপ হয়, তখন সমুদ্রে যে পরিমাণ ঢেউ বা রোলিং শুরু হয়, তাতে জান নিয়ে টানাটানি পড়ে যায়। বৈরী আবহাওয়ায় আমাদের পক্ষে সাগরে টিকে থাকতে অসম্ভব হয়ে পড়ে।’

শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালী গ্রামের জেলে আজগর আলী বলেন, ‘টানা ৫৮ দিন সাগরে যাওয়া বন্ধ থাকায় আমাদের কষ্টে সংসার চালাতে হচ্ছে। সরকারের দেওয়া চাল কিছুটা স্বস্তি দিলেও সংসার চালানো কঠিন। কারণ এই চালে পাঁচ সদস্যের পরিবার চালানো যায় না। ঘুরেফিরে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হয়।’

জীবনযুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে প্রতাপনগর এলাকার জেলে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাই। কিন্তু মাছের ন্যায্যমূল্য পাই না। উপকূলে ফিরে আসার পর হাতে কোনও কাজ থাকে না। সরকার থেকে যে চাল দেওয়া হয়, তা দিয়ে জীবন চালানো যায় না। শুধু চাল দিয়ে সংসার চলে না, তরিতরকারি কেনার টাকাও থাকে না। কে দেবে টাকা? অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে একেকটি দিন কাটছে।’

মানবাধিকারকর্মীর মতামত

মানবাধিকারকর্মী মাধব দত্ত বলেন, ‘শুধু চাল দিলেই একটি জেলের সংসার চলে না। চালের সঙ্গে তেল, লবণ, ডাল ও শাকসবজির মতো অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর জন্য তাদের নগদ অর্থ সহায়তা প্রয়োজন। সরকারের উচিত চালের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকার সময়ে জেলেরা বেকার হয়ে পড়েন। এ সময়ে তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে মৎস্যজীবী-বান্ধব ক্ষুদ্র শিল্প গড়ে তুললে তারা এই সময়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া জেলে পরিবারের নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। পর্যাপ্ত সহায়তার অভাবে এই মানুষগুলো মানবেতর জীবনযাপন করে। যার ফলে অনেক সময় তারা নিরুপায় হয়ে জলদস্যু-বনদস্যুসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তাই তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও পুনর্বাসনের জন্য সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

স্থানীয় প্রতিনিধির বক্তব্য

আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, ‘সমুদ্রগামী জেলেরা সরকারিভাবে চাল পেলেও সেটি প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য; জেলেরা মাত্র ৫৬ থেকে ৭৭ কেজির মতো চাল পান, যা দিয়ে তাদের সংসার চালানো সম্ভব হয় না। আবার বেশিরভাগ জেলে সরকারি সহায়তাও পান না।’

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য

এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বলেন, ‘সাতক্ষীরার বিশাল জনগোষ্ঠী মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে আমাদের তালিকাভুক্ত ৪৯ হাজার জেলের মধ্যে একটি বড় অংশ গভীর সমুদ্রে এবং উপকূলীয় নদ-নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। বিশেষ করে সরকারি নির্দেশনায় যখন মাছ ধরা বন্ধ থাকে, তখন আমরা জেলেদের খাদ্য সহায়তা হিসেবে চাল দিয়ে থাকি। তবে আমরা অনুভব করছি যে, শুধুমাত্র চাল দিয়ে একটি পরিবারের ভরণপোষণ কঠিন। তাই আমরা ঊর্ধ্বতন মহলে প্রস্তাব পাঠিয়েছি যাতে চালের পাশাপাশি ডাল, তেল বা আলুর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সহায়তার আওতায় আনা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘জেলেদের স্বাবলম্বী করতে আমরা বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ করছি। এ ছাড়া সমাজসেবা, সমবায় বা মহিলা বিষয়ক দফতরের মতো সরকারি অন্যান্য বিভাগগুলো যদি তাদের সেফটি নেটের আওতায় এই জেলেদের ভাগ করে নিয়ে সহায়তা করে, তবে দারিদ্র্য বিমোচন আরও দ্রুত সম্ভব হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি পুকুর ইজারা। জেলে সমিতিগুলো যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে পুকুরগুলোর ইজারা পায়, তবে জেলেদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে। আমরা চেষ্টা করছি নিবন্ধিত জেলেরা যেন নিয়মিত সুযোগ-সুবিধা পায়। পর্যায়ক্রমে অনিবন্ধিত জেলেদের সহায়তার আওতায় আনা হবে।’