মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও প্রবাসী আয়ে রেকর্ড বৃদ্ধি, ডলারের দামে চাপ
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে প্রবাসী আয় বাড়লেও ডলারের দামে চাপ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটেও প্রবাসী আয়ে রেকর্ড বৃদ্ধি, ডলারের দামে চাপ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে অস্থিরতা চলছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিপাকে ফেলেছে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, এই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশে প্রবাসী আয়ে বড় কোনো ধাক্কা লাগেনি। বরং এ সময়ে আগের চেয়ে বেশি প্রবাসী আয় আসা বেড়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত।

প্রবাসী আয়ে চাঙা ভাব

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মার্চ মাসের প্রথম ১১ দিনে দেশে ১৯২ কোটি মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ১১ মার্চ এক দিনেই দেশে এসেছে ১৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ১৩৩ কোটি ডলার। ফলে গত বছরের মার্চের প্রথম ১১ দিনের তুলনায় চলতি মাসের প্রথম ১১ দিনে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৪৪ শতাংশের বেশি, যা একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।

এছাড়া চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১১ মার্চ পর্যন্ত ২ হাজার ৪৩৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার প্রবাসী আয় দেশে এসেছে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছিল ১ হাজার ৯৮২ কোটি ডলার। এ ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ, যা অর্থনীতির জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করছে।

ডলারের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি খরচ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে প্রবাসী আয় কেনায় ডলারের দাম বেড়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকগুলো ১২৩ টাকা ৩০ পয়সা দরে প্রবাসী আয়ের ডলার কিনেছে, যা আগের মঙ্গলবারের ১২২ টাকা ৯০ পয়সার তুলনায় বেশি। বেশি দামে প্রবাসী আয় কেনার কারণে আমদানিতেও ডলারের দাম বেড়ে ১২৩ টাকা ৫০ পয়সা ছাড়িয়ে গেছে। এক সপ্তাহ আগেও আমদানির জন্য ব্যাংকগুলো ডলার বিক্রি করেছিল ১২২ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত।

এক আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ব্যাংকগুলো মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সুযোগ নিচ্ছে। হঠাৎ আমদানিতে ডলারের দাম এক টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং ভোক্তা পর্যায়েও পণ্যের দাম বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের শঙ্কা ও পরামর্শ

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অস্থিরতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বসবাসরত বাংলাদেশিরা আতঙ্কে আছেন। তারপরও ঈদ সামনে রেখে তাঁরা দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন, অনেকে জাকাতের জন্যও অর্থ পাঠাচ্ছেন। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও প্রবাসী আয় বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তাফা কে মুজেরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য আমাদের প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস। তাই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থানকারী শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে সরকারকে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুদ্ধ শেষ হলে দেশগুলো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে এবং তখন বাড়তি শ্রমিক প্রয়োজন হবে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি সুযোগ হতে পারে।

রিজার্ভ ও অর্থনৈতিক প্রভাব

প্রবাসী আয়ের এ চাঙা ভাবের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও। ১১ মার্চ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪২৯ কোটি ডলার বা ৩৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী, এই রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৫৬ কোটি বা ২৯ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার।

শীর্ষস্থানীয় আটজন অর্থনীতিবিদ মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে অর্থনীতির আসন্ন ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, সংকট কতটা হবে, তা এখনো পরিষ্কার না। বৈশ্বিক সংকট হলে রিজার্ভ ও ডলারের ওপর চাপ আসবে, তাই রিজার্ভ ধরে রাখতে হবে। এ ছাড়া সুদহার কমাতে এখনই নীতি সুদহারে হাত দেওয়া ঠিক হবে না। আসন্ন চাপ কেটে গেলে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

বেসরকারি একটি ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ডলারের দাম ১২৩ টাকার বেশি বাড়বে না—এমন বার্তা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমদানি দায় মেটানোর চাপ ও সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়বেই। তখন রিজার্ভ থেকেও ডলার-সহায়তা দিতে হতে পারে।