টানা সাড়ে চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়েনি। প্রতি মাসে যত মূল্যস্ফীতি হয়, তার চেয়ে কম হারে মজুরি বাড়ে। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাস থেকেই এমন পরিস্থিতি চলছে। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। সীমিত আয়ের মানুষের বাজার থেকে জিনিসপত্র কেনার সামর্থ্য কমে গেছে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের দুর্ভোগ
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সীমিত আয়ের এবং মধ্যবিত্ত পরিবারকে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেশের ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনানুষ্ঠানিক খাতে হওয়ায় মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি হার না বাড়লে শ্রমিকশ্রেণি বা নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি ও কষ্ট বাড়ে।
এদিকে টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল সোমবার মাসিক মূল্যস্ফীতির হিসাব প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, গত জুন মাসে মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। গত মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পরে অর্থাৎ আগের ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির প্রভাব
এমন অবস্থায় চলতি জুলাই মাস থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতনকাঠামোর আওতায় মূল বেতন পেতে শুরু করবেন। এতে প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীর বেতন বাড়বে। ফলে বাজারে আরেক দফা জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে, যা আবারও মূল্যস্ফীতি উসকে দেবে। সরকারি চাকুরে নন এমন সীমিত আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিপাকে পড়বে।
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শিগগিরই মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা নেই। তার ওপর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে, যা বাজারে প্রভাব ফেলবে। এত দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করায় সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। মানুষের প্রকৃত আয় দ্রুত কমেছে, খরচ করার সামর্থ্য সীমিত হয়েছে। মানুষ সংসার খরচ কাটছাঁট করতে গিয়ে বিনোদন, পর্যটনসহ নানা খাতে কম ব্যয় করছেন, যা ব্যবসা–বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মানুষের প্রকৃত আয় কমছে
২০২২ সালের জানুয়ারির পর থেকে এ বছরের জুন মাস পর্যন্ত কোনো মাসেই মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি মজুরি বৃদ্ধির হার। প্রতি মাসে গড়ে যত মজুরি বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি ছিল তার চেয়ে বেশি।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ। আর তখন গড় জাতীয় মজুরি হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপরে কোনো মাসেই মূল্যস্ফীতির হারকে ছুঁতে পারেনি মজুরি হার। অর্থাৎ ৫৩ মাস ধরে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। সর্বশেষ জুন মাসে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, আর মজুরি হার ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। তবে ২০২২ সালের আগে বেশির ভাগ সময়েই মূল্যস্ফীতির চেয়ে জাতীয় মজুরি হার বেশি ছিল।
দেশের ৬৪ জেলা থেকে ৬৩ ধরনের মজুরিসংক্রান্ত তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করে মজুরি হার গণনা করে বিবিএস। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, নির্মাণ, কলকারখানা, পরিবহনসহ সব খাতের মজুরি ও বেতন দিয়ে আয় বাড়ল কি না, তা দেখা হয়।
মানুষের প্রকৃত আয় দ্রুত কমেছে, খরচ করার সামর্থ্য সীমিত হয়েছে। মানুষ সংসার খরচ কাটছাঁট করতে গিয়ে বিনোদন, পর্যটনসহ নানা খাতে কম ব্যয় করছেন, যা ব্যবসা–বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম
বিবিএসের হিসাবে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৮৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে হয়। দেশের ৫ কোটির বেশি নারী–পুরুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। ফলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মজুরি না বাড়লে তাঁদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
মূল্যস্ফীতি একধরনের করের মতো। ধরুন, আপনার প্রতি মাসে আয়ের পুরোটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং সেই অনুযায়ী আয় না বাড়লে আপনাকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হবে কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে খরচ কাটছাঁট করতে হবে।
বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন জাকির হোসেন। পরিবার নিয়ে থাকেন রাজধানীর কাওলা এলাকায়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাঁর কোনো বেতন বাড়েনি। ২০২৬ সালে বেতন ৫ হাজার টাকা বেড়ে ৪৫ হাজার টাকা হয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত তিন বছরে বাসাভাড়া বেড়েছে তিনবার। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। তিন–চার বছর আগে মাসে চার–পাঁচ হাজার টাকা জমাতে পারতাম, এখন পারি না। উল্টো মাসের শেষ দিকে টানাটানি পড়ে। কোনো মাসে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়।’
জাকির হোসেনের মতো এমন অসংখ্য সীমিত আয়ের ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে দু-তিন বছর ধরে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি একধরনের করের মতো। ধরুন, আপনার প্রতি মাসে আয়ের পুরোটাই সংসার চালাতে খরচ হয়ে যায়। কিন্তু হঠাৎ জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং সেই অনুযায়ী আয় না বাড়লে আপনাকে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হবে কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে খরচ কাটছাঁট করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোরালো পদক্ষেপ নেই
২০২১ সাল পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে (৭ শতাংশের নিচে) ছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করে। বিশ্ববাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে। দেশের বাজারে এর প্রভাব পড়ে।
ওই বছরের আগস্টে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হয়। তখনই মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে সাড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এরপর মূল্যস্ফীতির চাকার গতি আর থামানো যায়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তেমন জোরালো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারকে। তখন অর্থমন্ত্রীসহ নীতিনির্ধারকেরা বলেছিলেন, এই মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী বিশ্ববাজার।
গত তিন বছরে বাসাভাড়া বেড়েছে তিনবার। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। তিন–চার বছর আগে মাসে চার–পাঁচ হাজার টাকা জমাতে পারতাম, এখন পারি না। উল্টো মাসের শেষ দিকে টানাটানি পড়ে। কোনো মাসে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়।
জাকির হোসেন, বেসরকারি চাকরিজীবী
২০২২ সালে ডলারের দামও বেড়ে যায়। ডলার–সংকটে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকে। মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে বড় সংকট হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু তৎকালীন নীতিনির্ধারকেরা এই সংকটকে স্বীকৃতি দেননি এবং বড় কোনো পদক্ষেপও নেননি। অর্থনীতিবিদেরা অভিযোগ করেন, সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি ৭–৮ শতাংশে থাকলেও বাস্তবে অনেক বেশি ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই বছরের জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। আর ওই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা আগের ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংকোচন মুদ্রানীতি, সুদের হার বাড়ানো, কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে হয় সাড়ে ৮ শতাংশ। তবে শেষ দিকে আবার মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়ে। নতুন সরকার আসার পর তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি আছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ৩ পরামর্শ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন।
- এক. সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ বাড়বে। এতে সরকারি খাতের বাইরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তাই বেসরকারি খাতের মজুরি বা বেতন বাড়ানোর জন্য সরকারের পক্ষ থেকে চাপ দিতে হবে।
- দুই. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিসহ বিভিন্ন ধরনের কার্ড প্রচলন করা হচ্ছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রকৃত সুবিধাভোগী যেন এই সুবিধা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।
- তিন. বাজার সিন্ডিকেটসহ সার্বিক বাজার ব্যবস্থাপনায় তদারকি বাড়াতে হবে।



