ঈদ সামনে রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। ঈদ সামনে রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই ঈদের বাজার করতে শুরু করেছেন। এদিকে চাহিদা বাড়ায় কোনো কোনো পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর খুচরা বাজারে পোলাওয়ের চাল, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি, গরুর মাংস এবং ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। তবে চিনি, সেমাই ও মসলাজাতীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
ভোজ্য তেলের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শান্তিনগর, নিউ মার্কেট ও তুরাগ এলাকার নতুন বাজারে খোঁজ নিয়ে বিভিন্ন পণ্যের দামের এ চিত্র পাওয়া যায়। ভোক্তাদের অভিযোগ—ঈদ উপলক্ষ্যে বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা বাড়ায় একশ্রেণির ব্যবসায়ী সুযোগ বুঝে দাম বাড়াচ্ছেন। ভোক্তারা এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বাজারে গিয়ে দেখা যায়, খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বোতলজাত তেলের সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ লিটারের বোতল বাজারে কম পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে খোলা তেলের ওপর চাপ বেড়েছে। বর্তমানে বাজারে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯৩ টাকা দরে। এক সপ্তাহ আগে এই তেলের দাম ছিল ১৭৫ থেকে ১৮৫ টাকা। অর্থাত্ এক সপ্তাহের ব্যবধানে লিটারে প্রায় ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে।
একইভাবে খোলা পাম তেলের দামও গত এক সপ্তাহে লিটারপ্রতি ৬ থেকে ১৩ টাকা বেড়ে বর্তমানে ১৬৩ থেকে ১৬৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পাঁচ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলে ৩০ টাকা বেড়ে তা ৯৫০ থেকে ৯৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রতিদিন বাজারদরের প্রতিবেদন তৈরি করে। গতকাল সংস্থাটির এই প্রতিবেদনেও সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বাড়ার এ তথ্য তুলে ধরেছে।
পোলাওয়ের চাল ও মুরগির দামে চাপ
তুরাগ এলাকার নতুন বাজারের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের বিক্রেতা সাদ্দাম হোসেন বলেন, চাহিদামতো বোতলজাত তেলের সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাজারে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে খোলা সয়াবিন তেলের সরবরাহ রয়েছে।
ঈদের সময় পোলাওয়ের চালের চাহিদা বেশ বাড়ে। বাজারে গত এক থেকে দেড় সপ্তাহের ব্যবধানে চিনিগুঁড়া বা পোলাওচালের দাম কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৭৫ টাকা কেজি দরে, যা আগে ছিল ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা। খোলা চিনিগুঁড়া চাল বিক্রি হচ্ছে ১২৫ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে, যা আগে ছিল ১১০ থেকে ১৩০ টাকা। ঈদের আগে পোলাওয়ের চালের চাহিদা বাড়ায় দাম কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
শান্তিনগর বাজারের চালবিক্রেতা হুমায়ুন বলেন—ঈদের আগে দেখা যায়, বাজারে একসঙ্গে ক্রেতাদের চাপ পড়ে। আবার অনেকেই একসঙ্গে বেশি পরিমাণে পণ্য কেনে। ফলে বাজারে একধরনের চাপ তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে দামের ওপর। তিনি ভোক্তাদের একসঙ্গে বেশি পরিমাণে কোনো পণ্য না কেনার পরামর্শ দেন।
মুরগি ও গরুর মাংসের দামেও ঊর্ধ্বগতি
গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারে দাম বেড়েছে মুরগির। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ২১০ থেকে ২২০ টাকা দরে, যা গত সপ্তাহে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় পাওয়া গেছে। এ হিসাবে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। সোনালি মুরগির দামও বাড়তি। বর্তমানে এই মুরগি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে যা ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা।
তুরাগ এলাকার বাসিন্দা আমিনুল গতকাল নতুনবাজারে এসেছেন বাজার করতে। তিনি বলেন, ঈদ উপলক্ষ্যে চাহিদা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা মুরগির দাম বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, গত সপ্তাহে তিনি সোনালি মুরগি কিনেছিলেন ৩১০ টাকা কেজিতে। গতকাল তাকে ৩৫০ টাকা কেজিতে কিনতে হয়েছে।
মুরগির পাশাপাশি দাম বেড়েছে গরুর মাংসেরও। গতকাল তুরাগ এলাকার নতুন বাজারে গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৭৮০ টাকা কেজি দরে। তবে শান্তিনগর ও নিউ মার্কেট কাঁচা বাজারে ৮০০ থেকে ৮২০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে, যা গত সপ্তাহে এই দুই বাজারে ৭৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারের একজন মাংসবিক্রেতা বলেন, ঈদের দুই-এক দিন আগে গরুর মাংসের দাম আরো বাড়তে পারে। তিনি বলেন, মাংসের চাহিদা বাড়ায় এখন তাদের বেশি দামে গরু কিনতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে মাংসের দামের ওপর।
স্থিতিশীল দামের পণ্য ও ভোক্তাদের উদ্বেগ
দাম বাড়ার তালিকায় মসুর ডালও রয়েছে। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে গতকাল বাজারে বড়দানা মসুর ডাল ৯০ থেকে ১০৫ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে বাজারে কিছু কিছু পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। চিনি, সেমাই, পেঁয়াজ, আদা ও রসুনসহ বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়েনি। গতকাল বাজারে প্রতি কেজি চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। দেশি পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ৪০ টাকা কেজিতে। আমদানিকৃত আদা বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং রসুন ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে। সবজির বাজারও মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ঈদ সামনে রেখে আগামী কয়েক দিনে বাজারে ক্রেতার চাপ আরো বাড়তে পারে। ফলে কিছু পণ্যের দামে আরো ওঠানামা দেখা দিতে পারে। গতকাল শান্তিনগর বাজারে বাজারে করতে আসা বেলায়েত হোসেন বলেন, ঈদ উপলক্ষ্যে বাজারে সরকারের বিভিন্ন তদারকি সংস্থার নজরদারি বাড়াতে হবে। এতে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।
