গরমে ব্যবসা ভালো, বৃষ্টি হলেই বিপদ: জুতাসেলাই কর্মী রামকুমারের কথা
গরমে ব্যবসা ভালো, বৃষ্টি হলেই বিপদ: জুতাসেলাই কর্মী

ঢাকার ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনের ফুটপাতে জুতা সেলাইয়ের কাজ করেন রামকুমার বাবু। প্রতিদিন লালবাগ থেকে কিছু পথ হেঁটে, বাকিটা বাসে করে ফার্মগেটে আসেন তিনি। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় তাঁর সঙ্গে কথা হলে দেখা যায়, তিনি ভেজা ফুটপাতে নিজের বসার জায়গা পরিষ্কার করছিলেন। রামকুমারের ভাষায়, প্রচণ্ড গরম হলেও তাঁর ব্যবসায় কোনো সমস্যা হয় না; কিন্তু বৃষ্টি হলেই বিপদ! তখন আর ফুটপাতে বসা যায় না। কাস্টমারও (জুতা সেলাই বা পরিষ্কার করতে আসা ক্রেতা) আসেন না।

বৃষ্টিতে ব্যবসায় ধস

গতকাল বিকেলে প্রায় দুই ঘণ্টার প্রবল বৃষ্টি রাজধানীর জনজীবনে স্বস্তি নিয়ে এলেও রামকুমারের ভাবনায় ছিল অন্য কিছু। কখন বৃষ্টি থামবে, সেই আশায় ছিলেন তিনি। জুতা সেলাইয়ের কাজ করে যে আয় হয়, তা দিয়ে এই বাজারে সংসারের খরচ চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে বলে জানান রামকুমার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অহন যেই অবস্থা, মাস শ্যাষ অইলে ভাড়া দেওন যায় না। ধার করন লাগে। এর মইদ্দে জিনিসপত্রের যা দাম, হাত দেওন যায় না।’

৪৫ পেরোনো রামকুমারের মাসে আয় ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। গতকাল বিকেলে বৃষ্টি শুরুর আগপর্যন্ত মাত্র ২৫০ টাকা আয় হয়েছে বলে জানান তিনি। সাধারণত দিনে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয় তাঁর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সংসারের চাপ

কথায় কথায় রামকুমার আরও বলেন, লালবাগে দুই কক্ষের যে বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন, তার ভাড়া মাসে ছয় হাজার টাকা। এখন তাঁর পরিবারে আছেন চারজন—স্ত্রী, মেয়ে ও নাতনি; আরেক মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। রামকুমার বলেন, এখন নিত্যপণ্যের যা দাম; আর তাঁর যা আয়, তা দিয়ে হিসাব করে চলাও কঠিন। প্রতি মাসেই ধারদেনা করতে হয়। ধারদেনা থেকে কিছুতেই বের হতে পারছেন না তিনি।

একই অবস্থা ভ্যানচালক মো. লিটন মিয়ার। তিনি কাজ করেন মূলত কারওয়ান বাজারে। বিভিন্ন দোকানে মালামাল আনা–নেওয়ার কাজ করেন লিটন মিয়া। তিনি থাকেন মগবাজারের একটি মেসে। মাসে ভাড়া দিতে হয় চার হাজার টাকা। এর বাইরে আরও যুক্ত হয় রাতের খাবারের খরচ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভ্যানচালকের দুর্দশা

ভ্যান (ব্যাটারিচালিত) চালিয়ে যা আয় হয়, তা থেকে পরিবারের জন্যও কিছু টাকা পাঠাতে হয় লিটন মিয়াকে। তাঁর আয় দিনে গড়ে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। এর মধ্যে ভ্যানভাড়া বাবদ মালিককে দিতে হয় ৪০০ টাকা। দুপুরের খাবারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে দিন শেষে তাঁর কাছে ৪০০ টাকার বেশি থাকে না।

পঞ্চাশোর্ধ্ব লিটন মিয়ার বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে। পরিবারে সদস্য পাঁচজন। তিন সন্তানের মধ্যে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। ছোট ছেলে একটি দোকানে সহকারীর কাজ করেন। ছেলে যে টাকা বেতন হিসেবে পান, তা খুবই সামান্য বলে জানান তিনি।

গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কারওয়ান বাজারে কথা হয় লিটন মিয়ার সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সকাল ১০টার (রোববার) দিকে বাইর অইছি, ৪০০ টাকা ভাড়া পাইছি। এর মইদ্দে খাওন খরচ গেল। গাড়ির জমা দিতে অইব ৪০০ টাকা। আইজ আর ভাড়া না পাইলে কেমনে জমা দিমু জানি না।’

আগের মতো ভাড়া নেই

আগের মতো আর ভাড়া পাচ্ছেন না জানিয়ে লিটন মিয়া বলেন, ‘কেমনে যে চলি, হেইডা আমরাই জানি। কেউ খবর লয় না।’ পুরোনো লুঙ্গির ওপরে মলিন শার্ট আর কোমরে আধভেজা গামছা বাঁধা লিটন মিয়া শেষ কবে নতুন জামাকাপড় কিনেছেন, তা বলতে পারলেন না। শুধু বললেন, ‘নতুন কিছু কেমনে কিনমু? খাওনদাওন আর বাসাভাড়া দিয়াই তো সব ট্যাকা শ্যাষ হয়।’

প্রতি মাসেই এর–ওর কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করতে হয় জানিয়ে লিটন মিয়া বলেন, ‘মাস শ্যাষে ট্যাকা না দিলে ত আর বাড়িত থাকন যাইব না। কিছু ধার ছাড়া উপায় নাই।’