দিনাজপুর রেলস্টেশনের পাশের মোড়ে প্রতিদিন সকালে খন্তা-কোদাল নিয়ে হাজির হন একদল মানুষ। দেখলেই বোঝা যায়, তাঁরা শ্রমজীবী। কাজের খোঁজে প্রতিদিন এখানে এসে জড়ো হন। কেউ রঙের কাজ করেন, কেউবা ইট গাঁথেন, কেউ কাঠ-ফার্নিচার মেরামতের কাজ জানেন, আবার কেউ মাটি কাটেন তো কেউ অন্য কাজ করেন। সবাই অপেক্ষায় থাকেন কখন কে কাজ নিয়ে আসবেন।
রিকশা-মোটরসাইকেল বা গাড়ি থামলে কিংবা কেউ হেঁটে এলেও অপেক্ষমাণ শ্রমজীবী মানুষেরা ঘিরে ধরেন। জানতে চান, কী কাজ? কাজের কথায় মিলে গেলে শুরু হয় দরদাম। ১০টা পর্যন্ত চলে কাজ নিয়ে দর-কষাকষি। এরপর আর কেউ কাজ নিয়ে আসেন না। সম্প্রতি এক সকালে প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক সেখানে হাজির হন। তখন সেখানে একটি অটোরিকশা ঘিরে প্রায় ১০ মিনিট ধরে জটলা চলছিল।
কাছে গিয়ে জানা গেল, রামনগর গ্রামের নূর ইসলাম বাড়িতে ইট গাঁথার কাজ করাবেন। তাই রাজমিস্ত্রি খুঁজতে এসেছেন; কিন্তু শ্রমিকের মজুরি ফয়সালা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘জোড়া (শ্রমিক) ১ হাজার ৪০০ টাকা চায়। আমি বলেছি, ১ হাজার ৩০০ টাকা।’ এভাবেই প্রতিদিন সকালে দামাদামি করে ঠিক হয় কে কাকে কাজে নেবেন বা কে কার কাজে যাবেন। অন্যদিকে রাজমিস্ত্রিরা বলেন, এখন ধানের সময়, এত কমে কোথাও শ্রমিক পাওয়া যাবে না। তখন নূর ইসলাম জানান, তিনিও একজন শ্রমিক, গাড়ি চালান। জরুরি প্রয়োজন বলেই লোক নিচ্ছেন। এর বেশি দিতে পারবেন না। তবে দুপুরে খাওয়াবেন।
শ্রমিকেরা বলেন, ধানকাটার কাজ করলেও এর চেয়ে বেশি টাকা পাওয়া যায়। তবু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, কাজের জায়গা ও পরিধি দেখে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। দুজন রাজমিস্ত্রি নিয়ে অটোরিকশায় করে নূর ইসলাম চলে যান।
আবদুর রাজ্জাকের কষ্টের গল্প
সেখানে কথা হয় ৬০ বছরের আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে। জানালেন, দুই দিন ধরে তিনি কাজ পাচ্ছেন না। বন্যার ভাঙনে পড়ে ১৯৮৫ সালে পাবনা থেকে দিনাজপুর শহরে আসেন। এক রেল কর্মকর্তার বাসায় কাজের সুবাদে রেলের জায়গায় থাকার সুযোগ পেয়েছেন। ঝুপড়িতে থাকেন, ভাড়া লাগে না; কিন্তু কাজ না জুটলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘হাত পাতার অভ্যাস নেই, তাই ৬০ বছর বয়সেও কাজ খুঁজি; কিন্তু বয়সের কারণে এখন আর সহজে কেউ কাজে নিতে চায় না।’ তিনি জানান, বাড়িঘর ও জঙ্গল পরিষ্কারের কাজ করতে পারেন। দিনে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পান। তবে সেই আয় দিয়ে এখন আর সংসার চলে না।
আক্ষেপ করে আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘সব জিনিসের দাম বাড়ে, হামাগো দাম বাড়ে না। পটোল কিনতে গেলে ৭০ টাকা লাগে। এক কোরবানি থেকে আরেক কোরবানি পর্যন্ত গোশত খাওয়া হয় না। কাজ না পেলি কচুর শাক কিনে বাড়ি যাব। ১০টা বাজি গেছে। আজ আর কাজ হবি না।’
অন্যান্য শ্রমিকদের অবস্থা
রাজ্জাকের মতো একই অবস্থা এখানকার আরও অনেকের। লিয়াকত আলী ১৫ বছর ধরে এখানে কাজ খুঁজতে আসেন। আরেক শ্রমিক লিয়াকত মিয়া কাজ খুঁজছেন ২০ বছর ধরে। তাঁরা জানান, কোনো দিন কাজ পান, কোনো দিন পান না। সেদিন কাজ না পাওয়ায় শ্রমিক দুলাল মিয়াকেও খুব হতাশ দেখা গেল।
রংমিস্ত্রি জাবেদ হোসেন জানান, ৪০ বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। আটতলা ভবনে উঠেও রং করতে পারেন। রঙের কাজ না পেলে প্লাস্টারের কাজ করেন। তবে যা আয় হয়, তা দিয়ে চলতে অসুবিধা হয়। তাই মাছ কেনেন না। নদী থেকে মাছ ধরে খান।
বিরল উপজেলা থেকে ভোর ছয়টায় এসে অপেক্ষা করছিলেন আফজাল মিয়া। সেদিনও কাজ পাননি। তাঁর ভাষায়, ঝড়বৃষ্টির কারণে কাজ কম; কিন্তু কাজ না পেলেও সপ্তাহ শেষে কিস্তি দিতে হয়। তাই অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই। কিছুদিন পর ধানকাটা শুরু হলে সেই কাজে চলে যাবেন।
দারিদ্র্য ও ভাতার চিত্র
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, দিনাজপুরে ভূমিহীন কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের হিসাবে অবশ্য এই জেলায় দারিদ্র্যের হার ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনাজপুর জেলায় তিন লাখের বেশি মানুষ কোনো না কোনো সরকারি ভাতা পান। আর জেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে নবাবগঞ্জ উপজেলার জয়পুর ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। পাইলট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ৫৫৩ জন এই কার্ড পেয়েছেন।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রোকনুজ্জামানের কাছে শ্রমজীবীদের ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আবদুর রাজ্জাকদের এই কার্ড পাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, এই কার্ড পরিবারের নারীপ্রধানদের দেওয়া হয়; আর নতুন বরাদ্দ না থাকায় নতুন কাউকে কার্ড দেওয়া যাচ্ছে না। তাই নতুন অর্থবছরে নতুন বরাদ্দের প্রত্যাশায় আছেন তাঁরা। ফলে আপাতত আবদুর রাজ্জাকদের মতো দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার আশা পূরণ হওয়ার সুযোগ নেই। কাজের জন্য প্রতিদিন সকালে রেলস্টেশনে এসে অপেক্ষা করাই যেন তাঁদের নিয়তি।



