টানা ৪৪ মাস পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৬ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ফিরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (২৪ জুন) দিন শেষে দেশের গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
রিজার্ভের পতন ও পুনরুদ্ধার
এর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়। পরবর্তী সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ডলারের বাজারে চাপের কারণে রিজার্ভ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় গ্রস রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, ২৪ জুন পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রস) রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ১০৩ দশমিক ৮৯ মিলিয়ন ডলার।
আইএমএফ পদ্ধতিতে রিজার্ভ
অপরদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যালান্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম-৬) পদ্ধতি অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ৫৫২ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন ডলার বা ৩১ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২৩ জুন পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৫ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। একদিনের ব্যবধানে রিজার্ভে প্রায় ৩০৬ মিলিয়ন ডলার যোগ হয়েছে।
বিপিএম-৬ পদ্ধতি চালু
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভের হিসাব প্রকাশ করছে। ওই সময় এই পদ্ধতিতে দেশের রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে। পরে গত ১৪ জুন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পাওয়ার পর রিজার্ভ ৩১ বিলিয়ন ডলারের ঘর ছাড়ায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় ও অন্যান্য অপ্রাপ্য সম্পদ বাদ দিয়ে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসাব করা হয়। ফলে গ্রস রিজার্ভের তুলনায় এ হিসাব কিছুটা কম দেখা যায়।
রিজার্ভের সর্বোচ্চ ও পতন
বাংলাদেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায় ২০২১ সালের আগস্টে, যখন রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। তবে পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের চাহিদা এবং অর্থপাচারসহ বিভিন্ন কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকে। একই সময়ে প্রতি ডলারের বিনিময় হার প্রায় ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ২০২৪ সালের আগস্টে বিপিএম-৬ হিসাব অনুযায়ী রিজার্ভ নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।
রেমিট্যান্সের ভূমিকা
বিশ্লেষকরা বলছেন, রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং চ্যানেলে ৩৪ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় যা ৫ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার বা ১৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেশি। এর আগের অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ইতিবাচক ধারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করার পাশাপাশি ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



