চাঁদাবাজির নতুন যুগ: বরিশালে ‘চাপ থেরাপি’ ও অর্থনীতির উদ্ভাবন
চাঁদাবাজির নতুন যুগ: বরিশালে ‘চাপ থেরাপি’ ও অর্থনীতি

বাংলাদেশ চিরকালই উর্বর ভূমি। এখানে যেমন ফসলের ফলন ভালো, তেমনই নিত্যনতুন ধারণার চাষবাসও চমৎকার। বিশেষ করে ‘চাঁদাবাজি’ নামক যে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পটি আমাদের অর্থনীতিকে সচল রেখেছে, সেখানে প্রতিনিয়ত এমন সব উদ্ভাবন আসছে যে সিলিকন ভ্যালির স্টার্টআপগুলোও লজ্জায় মুখ লুকাবে।

সম্প্রতি বরিশাল নগরের এক আবাসন ব্যবসায়ীর কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া এক যুগান্তকারী ঘটনা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। অভিযোগ হলো, এক ব্যবসায়ীকে তাঁর নিজের কার্যালয়ে আটকে রেখে ভয়ভীতি, শারীরিক নির্যাতন ও চরম অপমানের মাধ্যমে কোটি টাকার চেক এবং ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়েছে। সিসিটিভির ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণ করবে আদালত—কিন্তু ভিডিওটি যে প্রশ্নগুলো তুলেছে, তার বিচার আদালতের একার পক্ষে সম্ভব নয়। চাঁদাবাজি ও মব জাস্টিসের ডিজিটাল যুগে এটি একটি মাইলফলক। অস্ত্র নেই, গোলাবারুদ নেই, কোনও বড় বিনিয়োগ নেই, কেবল ‘ঝোঁপ বুঝে কোপ’ এবং একটি নির্দিষ্ট ও স্পর্শকাতর অঙ্গে ‘চাপ’। ব্যাস, কোটি টাকার চেক এবং ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিমেষেই হাতের মুঠোয়!

পরিবেশবান্ধব ও জিরো-বিনিয়োগের ফর্মুলা

এতদিন ধরে চাঁদাবাজি করতে গেলে কত ঝামেলা পোহাতে হতো! অস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া কঠিন, অবৈধ অস্ত্র কিনতে গেলে পুলিশের ভয়, তার ওপর আবার গুলির খরচ। আবার মারধর করতে গেলে লাঠিসোঁটা লাগে, তাতে চামড়া কাটে, রক্তারক্তি হয়, সে এক বিশ্রী দৃশ্য। কিন্তু বরিশালের এই নতুন ‘চাপ থেরাপি’ সম্পূর্ণ আলাদা। এটি শতভাগ পরিবেশবান্ধব এবং জিরো-বিনিয়োগের একটি মহৎ ফর্মুলা। এখানে কোনও বারুদ পোড়ানো হচ্ছে না বলে বায়ুদূষণের মতো জিরো কার্বন ফুটপ্রিন্টের কোনও সুযোগ নেই। ঈশ্বর প্রদত্ত হাতের পাঁচটি আঙুলই এখানে একমাত্র খরচবিহীন কাঁচামাল হওয়ায় কোনও এক্সট্রা ইনভেস্টমেন্টও লাগে না। তাছাড়া কোনও গুলির আওয়াজ না থাকায় এই শব্দহীন অপারেশনে আশেপাশের মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লজ্জার মনস্তত্ত্ব: অপরাধীদের নতুন অস্ত্র

এই নতুন ফর্মুলার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো—এর মনস্তাত্ত্বিক দিক, যা লজ্জার মনস্তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দেশের একজন সম্মানিত ব্যবসায়ী বা সম্ভ্রান্ত নাগরিক যদি আক্রান্ত হন, তবে তিনি থানায় গিয়ে বলতে পারেন যে তাকে পিস্তল ঠেকিয়েছিল বা লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে। এতে একটা বীরত্বের ভাব থাকে এবং ভুক্তভোগী নিজেকে ‘মজলুম’ হিসেবে সমাজে জাহির করতে পারেন। কিন্তু পুলিশ বা মিডিয়ার সামনে এসে যদি বলতে হয় যে ওনারা আমার ওই বিশেষ জায়গাটা চেপে ধরেছিলেন, তবে সেখানেই গল্পের শেষ! বাঙালি সমাজের যে চিরায়ত লজ্জা বা শরম, তা হিরোকে এক মুহূর্তেই জিরো বানিয়ে দেয়। লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগী নিজেই চাইবেন বিষয়টি যেন ধামাচাপা পড়ে, ফলে মামলা হওয়ার ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। চাঁদাবাজি জগতের জন্য এর চেয়ে নিরাপদ ও টেকসই প্রক্রিয়া আর কী হতে পারে!

স্মার্ট বাংলাদেশের নতুন সংস্করণ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে দেশে আইনের শাসন নিয়ে নানা পণ্ডিত নানা কথা বলছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর লম্বা লম্বা প্রতিবেদন লিখছে যে, দেশে নাকি ‘মব জাস্টিস’ বা জনতার বিচার বাড়ছে। তবে সমালোচকেরা শুধু নেতিবাচক দিকটাই দেখছেন, এর ইতিবাচক দিকটা ভাবছেন না। আগে যেকোনও বিরোধ মেটাতে আদালত পাড়ায় বছরের পর বছর ঘুরতে হতো এবং উকিলের পেছনে লাখ লাখ টাকা ঢালতে হতো। আর এখন চার-পাঁচ জন মিলে একটা ‘মব’ বা দল গঠন করে প্রতিপক্ষ বা পাওনাদারকে টার্গেট করলেই তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যায়। তার অফিসে ঢুকে সরাসরি সেই অতি সংবেদনশীল অঙ্গে হাত দিয়ে অপারেশন থেরাপি চালালে সর্বোচ্চ তিন মিনিটের মধ্যে সব বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে চেক বইয়ে সই রেডি হয়ে যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশের পর এটিই তো সত্যিকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর প্রতিচ্ছবি, যেখানে আদালত ও আইনের ওপর চাপ কমিয়ে এই যুবসমাজ নিজেদের দায়িত্ব নিজেরা হাতে তুলে নিচ্ছে।

প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তার জয়

বাংলাদেশ সম্পর্কে একটি কথা বহুদিন ধরে প্রচলিত— এটি নাকি ‘সব সম্ভবের দেশ’। কথাটি আমরা সাধারণত গর্ব করেই বলি। পৃথিবী যখন ভাবে, বিস্মিত হওয়ার মতো আর কিছু বাকি নেই, তখন বাংলাদেশ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলে, ‘একটু অপেক্ষা করুন, আমাদের এখনও কিছু দেখানোর আছে।’ অপরাধের ইতিহাস মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। কোথাও ছুরি, কোথাও বন্দুক, কোথাও বিষ, কোথাও অপহরণ, কোথাও ব্ল্যাকমেইল। ইতালির মাফিয়া, জাপানের ইয়াকুজা, রাশিয়ার ব্রাতভা কিংবা লাতিন আমেরিকার কার্টেল, প্রত্যেকেই অপরাধের জগতে নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছে। কিন্তু বাঙালি বরাবরই একটু আলাদা। আমরা অনুকরণে নয়, উদ্ভাবনে বিশ্বাস করি। আমাদের অপরাধজগৎও তাই পুরোনো পাঠ্যবই পড়ে না, তারা নতুন সিলেবাস লেখে। বরিশালের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে এই প্রাচীন শিল্পটি এখন এক বৈপ্লবিক আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবী যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ নিয়ে দিনরাত মাথা ঘামাচ্ছে, আমরা তখন ব্যস্ত সম্পূর্ণ নিজস্ব ‘প্রাকৃতিক বুদ্ধিমত্তা’র প্রয়োগ ঘটাতে। অপরাধও এখন করপোরেট স্টার্টআপের মতো রূপ নিয়েছে, যেখানে লক্ষ্য হলো—কম খরচে, দ্রুততম সময়ে, সর্বনিম্ন ঝুঁকিতে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা। আর এটাই বোধহয় আমাদের বর্তমান সমাজের নিজস্ব ‘ইনোভেশন ইকোনমি’।

চিকিৎসকের উদ্বেগ বনাম অর্থনীতির স্বার্থ

আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা আবার একটু বেশিই সংবেদনশীল। তারা বলছেন যে, অণ্ডকোষ মানবদেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল অঙ্গ এবং সেখানে তীব্র চাপ দিলে সাময়িক অসহনীয় ব্যথা থেকে শুরু করে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি হতে পারে, যা নিষ্ঠুর ও অমানবিক। তবে এই চিকিৎসকেরা শুধু অ্যানাটমি বোঝেন, অর্থনীতি বোঝেন না। দেশের এই অর্থনৈতিক মন্দার বাজারে, যেখানে ডলার সংকট চলছে, সেখানে কোটি টাকার আবাসন ব্যবসা বা পাওনা টাকা উদ্ধার করতে যদি সামান্য একটু অসহনীয় ব্যথা সহ্য করতে হয়, তবে দেশের স্বার্থে সেই স্যাক্রিফাইসটুকু তো করতেই হবে। স্থায়ী ক্ষতি হলে হোক, দেশের অর্থনীতি তো সচল হচ্ছে!

সামাজিক অবক্ষয় ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা

অনেকে আবার অপরাধের নিত্যনতুন কৌশল বা নৃশংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের মতে, একটি স্পর্শকাতর অপরাধের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর লাখ লাখ মানুষ সেটি দেখে। কেউ হয়তো ক্ষুব্ধ হয়, কেউ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হয়, কিন্তু এক বিরাট অংশ আবার সেটিকে নিয়ে ট্রল বা কৌতুক বানাতে শুরু করে। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক অসাড় সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে অন্যের চরম দুর্দশা কিংবা অপরাধের নৃশংসতাও আমাদের নিত্যদিনের সস্তা বিনোদনের উপাদানে রূপান্তরিত হয়। সভ্যতার আসল অবক্ষয় ঠিক এভাবেই শুরু হয়।

আমাদের দেশের মানুষ অন্যায়ের শিকার হওয়ার চেয়ে সামাজিক অপমানকে অনেক বেশি ভয় পায়। যেকোনও সাধারণ নাগরিক অর্থ বা সম্পদ হারানোর চেয়ে নিজের মান-সম্মান ও ইজ্জত হারানোকে জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি বলে মনে করে। অপরাধীরা এখন এই মনস্তত্ত্বকে খুব ভালোভাবে চিনে গেছে। তারা বুঝে গেছে যে মানুষের শরীরের ক্ষত বা ব্যথা একসময় ওষুধে কমে যায়, কিন্তু তীব্র সামাজিক অপমানের ভয় মানুষের মনে আজীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়। সুতরাং, এই নতুন যুগের অপরাধবিজ্ঞান শুধু মানুষের শরীরকে আঘাত করে না, বরং সরাসরি তার আত্মসম্মানকে জিম্মি করে ফেলে।

আজ আমরা হয়তো অন্যের এই চরম অপমান দেখে হাসছি, সামাজিক মাধ্যমে মিম বানাচ্ছি কিংবা শব্দ নিয়ে রসিকতা করছি। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো—যে সমাজ অপরাধকে বিনোদন হিসেবে দেখতে শুরু করে, একদিন সেই অপরাধই তার চরম বাস্তবতায় পরিণত হয়। আজ যিনি ভুক্তভোগী, তিনি একজন ব্যবসায়ী, কাল হয়তো তিনি অন্য কেউ, আর পরশু হয়তো আপনি, আমি কিংবা আমাদের খুব পরিচিত কোনও প্রিয়জন। রাষ্ট্রের পতন বা আইনি কাঠামোর ধ্বংস একদিনে হুট করে হয় না। তা শুরু হয় সমাজের ছোট ছোট আপস দিয়ে, একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যতিক্রমকে ‘স্বাভাবিক’ ধরে নেওয়ার প্রবণতা দিয়ে। যখন আমরা একটি স্পষ্ট অপরাধকে ‘এমন তো হতেই পারে’ বলে মেনে নিই, তখনই পতনের বীজ রোপিত হয়!

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট