হাওরে বাম্পার ফলন, তবুও কৃষকের মুখে হতাশা: প্রতি মণে ২০০ টাকা লোকসান
হাওরে বাম্পার ফলন, তবুও কৃষকের মুখে হতাশা

হাওরে সোনালি ধান, কিন্তু কৃষকের চোখে অশ্রু

হাওরের বিস্তীর্ণ জলভেজা মাঠে এখন ধানের সোনালি রঙের সমারোহ। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কৃষকের ঘরে এবার আনন্দের বন্যা বয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। মাঠে ফসলের হাসি থাকলেও কৃষকের চোখে এখন নীরব হতাশা ও ক্ষোভের ছায়া। নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলখ্যাত খালিয়াজুরী উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ধানের ফলন হয়েছে রেকর্ড পরিমাণে। দীর্ঘ পরিশ্রম, ঘাম ঝরানো দিন-রাত এবং প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই শেষে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু সেই হাসি এখন বাজারের দরপতনে ম্লান হয়ে গেছে।

বাজারে ধানের দাম, উৎপাদন খরচের চেয়ে কম

স্থানীয় বাজারে ৪১ কেজি সমান এক মণ চিকন ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। অথচ সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে প্রতি মণে উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার টাকা। ফলে প্রতি মণে কৃষকের লোকসান ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এই লোকসান কৃষকদের আর্থিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে।

উপজেলার কৃষক লিটন মিয়ার কণ্ঠে ক্ষোভ আর ক্লান্তি একসঙ্গে ধরা দেয়। তিনি বলেন, “সার, শ্রমিক আর সবকিছুর দাম বাড়লেও ধানের দাম বাড়ে না। অনেক কষ্ট করে ফসল তুলেছি, কিন্তু এখন দেখি উৎপাদন খরচই উঠছে না।” রসুলপুর গ্রামের আরেক কৃষক আরজু মোল্লার চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার খরচ মেটাতেই তারা হিমশিম খাচ্ছেন। ঋণের বোঝা শোধ করতে বাধ্য হয়েই অনেক কৃষক কম দামে ধান বিক্রি করছেন বলে জানান তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ বিশাল

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে খালিয়াজুরীতে ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার মেট্রিক টন, যা প্রায় ৩৬ লাখ মণের সমান। হিসাব বলছে, প্রতি মণে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা লোকসান ধরলে পুরো উপজেলায় সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৪ থেকে ৭২ কোটি টাকার মধ্যে। এই বিশাল অঙ্কের লোকসান এখন হাওরের কৃষকের স্বপ্নকে আরও ভারী করে তুলছে।

সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি

উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা মুকুল থিগিদি জানান, সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিলারদের সীমিত চাহিদা ও বাজার ঝুঁকির কারণে বেশি দামে ধান কেনা সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে খালিয়াজুরী কলেজের প্রভাষক জিয়াউল হক হিমেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সংকট তুলে ধরে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ হারাবে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।”

প্রশাসনের পদক্ষেপ ও আশা

খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম জানান, কৃষকদের দুর্ভোগ প্রশাসনের নজরে এসেছে। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের প্রস্তুতি চলছে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা নিশ্চিত করা গেলে বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন।

হাওরের এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে তাই এখন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য—একদিকে সোনালি ধানের ঢেউ, অন্যদিকে কৃষকের নীরব হতাশা। প্রকৃতি ফসল দিলেও বাজার যেন কেড়ে নিচ্ছে সেই ফসলের ন্যায্য মূল্য। কৃষকের প্রশ্ন একটাই—“ফসল ফলিয়ে যদি লাভ না হয়, তবে এই পরিশ্রমের মূল্য কোথায়?”