বাংলাদেশে ক্যাপসিকাম চাষের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ: উচ্চ আয়ের সম্ভাবনা ও ক্রমবর্ধমান বাজার চাহিদা
বাংলাদেশের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চোখ ধাঁধানো রঙিন ক্যাপসিকাম দেশে একটি জনপ্রিয় সবজিতে পরিণত হয়েছে। ঢাকাসহ সারাদেশের বাজার ও সুপারশপগুলোতে সবুজ, হলুদ, লাল, কমলা ও বেগুনি রঙের ক্যাপসিকাম দেখা যাচ্ছে। কৃষিবিদরা বলছেন, প্রতিটি রঙের পেছনে আলাদা স্বাদ ও পুষ্টিগুণ লুকিয়ে আছে।
চাহিদা বৃদ্ধি ও কৃষকদের আগ্রহ
কৃষকদের মতে, প্রাথমিক ব্যয় বেশি হওয়া সত্ত্বেও বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক ভালো আয়ের সুযোগ থাকায় উচ্চমূল্যের এই সবজি চাষের দিকে উদ্যোক্তারা বেশি ঝুঁকছেন। কৃষি বিভাগের টিস্যুকালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, "ক্যাপসিকাম কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যায় এবং আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে সালাদ, পিৎজা, সাসলিকসহ বিভিন্ন ফাস্টফুড আইটেমে অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে শহরাঞ্চলসহ সর্বত্র এর স্থায়ী বাজার চাহিদা তৈরি হয়েছে।"
উৎপাদন বৃদ্ধির পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়নের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ক্যাপসিকামের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। দেশের মোট উৎপাদনের ৫৫ শতাংশই ভোলা জেলায় আবাদ হয়। ভোলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. খায়রুল ইসলাম মল্লিক জানান, জেলার দুটি উপজেলায় ১৮০ হেক্টরের মতো জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ হচ্ছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ক্যাপসিকাম উৎপাদন হয়েছে ৪৭৫ টনের মতো, যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল দেড়শ টনের কাছাকাছি।
পুষ্টিগুণ ও চাষের পদ্ধতি
কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে, ক্যাপসিকামে ভিটামিন এ, সি এবং কোলাজেন থাকে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বক ও অস্থি সন্ধি ভালো রাখে। এছাড়া ক্যাপসিসিন নামক উপাদান শরীরে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
যশোরের ক্যাপসিকাম চাষি মানিক রাজা বলেন, "চারা লাগানোর দু মাস পর গাছে ফল আসতে শুরু করে, কিন্তু সবুজ রং থেকে অন্য রং আসতে তিন মাসের মতো সময় লাগে। এরপর একই গাছ থেকে অন্তত নয় মাস পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।"
অর্থনৈতিক সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাপসিকাম চাষ করে কৃষকেরা প্রতি হেক্টরে সাধারণত ১৪-১৮ লাখ টাকা আয় করেন। মানিক রাজার উদাহরণে, তিনি শুরুতে ৬/৭ বিঘা জমিতে প্রায় ২৪ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন, কিন্তু প্রথম বছরই ৩৫ লাখ টাকার বিক্রি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে প্রতি বছর গড়ে ৫০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে।
তবে ক্যাপসিকাম চাষ বেশ ব্যয় ও কষ্টসাধ্য, এবং কৃষকেরা মৌসুমজুড়ে মাঠেই থাকেন। তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, "রঙিন ক্যাপসিকাম বাংলাদেশের জন্য একটি উচ্চমূল্যের এবং সম্ভাবনাময় ফসল। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বল্প পরিসরের জমিতেও উচ্চ আয় করা সম্ভব।"
চাষের সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশের ভোলা, সিলেট, নওগাঁ, চুয়াডাঙ্গা, কুড়িগ্রাম ও যশোর অঞ্চলে ক্যাপসিকাম চাষ হচ্ছে। চলতি বছর কুমিল্লাসহ আরও কয়েকটি জায়গায় প্রথমবারের মতো চাষের তথ্য পাওয়া গেছে। অনেকে শখ করে টবেও ক্যাপসিকাম উৎপাদনের চেষ্টা করছেন, যা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে।
কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট তিন ধরনের বীজ উদ্ভাবন করেছে, যা বিএডিসির মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে। প্রতি বছর চাষের পরিমাণ বাড়ছে বলে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী বীজ আমদানি শুরু করেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, নদীর পলি পড়া ও সঠিক সার ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতি হেক্টরে ৩০-৩৫ টন পর্যন্ত ফলন সম্ভব।



