সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের বোরো ধান উৎপাদনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই অঞ্চলের ফসল সুরক্ষার জন্য প্রতি বছর আলাদা বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, যেখানে স্থানীয় কৃষকরাও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিরুদ্ধে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ক্রমাগত উঠে আসছে। সম্প্রতি সুনামগঞ্জ শহরে অনুষ্ঠিত একটি কৃষক-জনতার গণসমাবেশে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভেরই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
বাঁধ নির্মাণে লুটপাটের অভিযোগ
সমাবেশ থেকে উঠে আসা অভিযোগ অনুযায়ী, হাওর রক্ষা বাঁধগুলো এখন আর ফসল সুরক্ষার কার্যকর উপায় হিসেবে কাজ করছে না। বরং, এগুলো একটি অসাধু কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের জন্য ‘লুটপাটের ব্যবসায়’ পরিণত হয়েছে। প্রতিবছর হাওরে বোরো ফসলের সুরক্ষায় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ বছরও ১২টি উপজেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এই বিপুল ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। কৃষকরা দাবি করছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ও অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে উল্টো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার সংস্কৃতি
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই এবং গণশুনানি না করেই প্রাক্কলন তৈরি করার একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা আমলাতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতারই অন্যতম উদাহরণ। কৃষকদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত ১০টি দাবির প্রতিটিই অত্যন্ত যৌক্তিক বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে, জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান, কৃষিঋণ মওকুফ এবং বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবিগুলো এখন সময়ের অপরিহার্য চাহিদা হিসেবে দেখা দিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করার দাবি করলেও, নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ না হওয়া এবং মাটির কাজে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ সাধারণ মানুষের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
টেকসই সমাধানের অভাব
বাঁধের নামে মাটি লুটের এই প্রক্রিয়া অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। হাওরের প্রাণস্বরূপ নদী ও খালগুলো খনন না করে কেবল প্রতিবছর মাটির বাঁধ দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। ধোপাযান বা যাদুকাটার মতো নদীগুলো থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা এবং নদীগুলোর নাব্যতা পুনরুদ্ধার করাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে এ বছর প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ধান কাটা শুরু হবে। এই মুহূর্তে কৃষকদের মনে প্রশান্তি থাকার কথা থাকলেও, তারা বাঁধের স্থায়িত্ব এবং জলাবদ্ধতা নিয়ে গভীর আতঙ্কে রয়েছেন। তাদের এই দুশ্চিন্তা দূর করার দায়িত্ব সরাসরি সরকারের উপর বর্তায়। আমরা আশা করি যে, সরকার কৃষকদের এই উদ্বেগ ও দাবিগুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।



