সুনামগঞ্জে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদে কৃষক-জনতার গণসমাবেশ
সুনামগঞ্জে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে কৃষক-জনতার গণসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ শনিবার দুপুরে শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জেলার ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’-এর উদ্যোগে এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রতিনিধি ও স্থানীয় কৃষকেরা অংশগ্রহণ করেন। এর আগে প্রতিটি উপজেলায় একই ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়েছিল।
দাবি ও অভিযোগের মূল বিষয়
সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হকের সঞ্চালনায় সমাবেশে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, হাওরে বাঁধ নির্মাণ এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। জলাবদ্ধতায় ফসলের ক্ষতি এ অভিযোগকে আবারও সামনে এনেছে। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও লুটপাটের কারণে হাওরের ক্ষতি হচ্ছে। বক্তারা উল্লেখ করেন, বাঁধ এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। হাওর ও ফসল রক্ষায় পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া এবং কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের দাবি জানান তাঁরা।
১০ দফা দাবির উল্লেখযোগ্য বিষয়
সমাবেশে উত্থাপিত ১০ দফা দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
- জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
- ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কৃষিঋণ ও বেসরকারি সংস্থার ঋণ মওকুফ করা।
- অপরিকল্পিত বাঁধ চিহ্নিত করে অপসারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্লুইসগেট নির্মাণ।
- অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত বরাদ্দ প্রকল্প পুনঃতদন্ত করা।
- বাঁধের নামে মাটি লুট বন্ধ করা।
- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও তাঁদের প্রত্যাহার করা।
- সময়মতো সার্ভে ও প্রাক্কলন সম্পন্ন এবং গণশুনানি নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র প্রকাশ, হাওরের সঙ্গে যুক্ত নদী-খাল-বিল খনন এবং যাদুকাটা, ধোপাযান, চিলাইনদী, খাসিয়ামারাসহ বিভিন্ন নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবিও তুলে ধরা হয়।
সমাবেশে অংশগ্রহণকারী ও বক্তারা
সমাবেশে স্বাগত বক্তব্য দেন হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন-এর সহসভাপতি ওবায়দুল মুন্সী। বক্তব্য দেন সংগঠনের উপদেষ্টা সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সৈয়দ মহিবুল ইসলাম, শিক্ষক চিত্তরঞ্জন তালুকদার, জেলা পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান মনির উদ্দিন, সংস্কৃতিকর্মী জাহাঙ্গীর আলম, সমাজকর্মী নুরুল হকসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। কৃষকদের মধ্যে বক্তব্য দেন সুলতানা বেগম, মতিউর রহমান, মির্জা ফারুক, শাহাব উদ্দিন, আবদুল হান্নানসহ অনেকে।
অভিযোগ অস্বীকার ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
তবে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার। তিনি বলেন, কাবিটা নীতিমালা অনুযায়ী হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এ বছর সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। কাজের নির্ধারিত সময় ছিল ১৫ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
কৃষি পরিস্থিতি ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ বছর সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। সপ্তাহখানেক পর থেকেই হাওরে ধান কাটা শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



