রাজশাহীর তানোরের মাঠে যাযাবর খামারিদের শত শত গরুর পাল
রাজশাহীর তানোর উপজেলার জুমার পাড়া এলাকার বিস্তীর্ণ খোলা মাঠজুড়ে এখন শত শত গাভী ও বাছুরের পালের অবাধ বিচরণ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে আগত খামারিরা তাদের বিশাল গরুর পাল নিয়ে তানোরের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করছেন। প্রাকৃতিক পরিবেশে গরু লালন-পালন এবং মাঠেই দুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহের এই আদি পেশাটি আজও তারা টিকিয়ে রেখেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আগত খামারিদের যাযাবর জীবন
খামারিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার রানীহাটি এলাকা থেকে রফিকুল ইসলামসহ আট জন খামারি প্রায় চারশ’র বেশি গরু নিয়ে তানোরের মাঠে এসেছেন। বছরের বিভিন্ন সময় তারা এক উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় ঘুরে বেড়ান। যেখানে জমির ফসল কাটা শেষ হয় এবং পর্যাপ্ত ঘাস পাওয়া যায়, সেখানেই তাবু গেড়ে অবস্থান নেন এই যাযাবর খামারিরা। সাধারণত একেকটি স্থানে তারা পনেরো থেকে বিশ দিন অবস্থান করেন।
খামারি রফিকুল ইসলামের বক্তব্য
খামারি রফিকুল ইসলাম জানান, তার পালে বর্তমানে একশ’ পঞ্চাশটি গাভী ও বাছুর রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বংশ পরম্পরায় আমরা এই পেশায় আছি। আমরা দেশি জাতের গরু পালন করি, যা সব পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং রোগবালাই কম হয়। প্রতিদিন মাঠেই গোয়ালারা এসে দুধ নিয়ে যান। একেকজন খামারি প্রতি মাসে দুধ বিক্রি করেই প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা আয় করেন।’
ভাদ্র মাসে গরু বিক্রির লক্ষ্য
মাঠেই বসবাস ও জীবনযাপন করা এই খামারিদের প্রধান লক্ষ্য থাকে ভাদ্র মাসে গরু বিক্রি করা। রফিকুল ইসলামের আশা, আসন্ন ভাদ্র মাসে অন্তত পনেরোটি গরু বিক্রি করবেন তিনি, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ছয় থেকে সাত লাখ টাকা। খামারিদের মতে, ভাদ্র মাসে গরুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং বাজারে দামও ভালো পাওয়া যায়।
অন্য খামারি লাল মোহাম্মদের অভিজ্ঞতা
একই পালে থাকা লাল মোহাম্মদ জানান, গত দশ বছর ধরে তিনি এই পেশার মাধ্যমে সংসার চালাচ্ছেন। বর্তমানে তার ষাটটি গরু রয়েছে। তিনি বলেন, ‘দুধ বিক্রির টাকায় আমাদের দৈনন্দিন খরচ ও পরিবারের চাহিদা পূরণ হয়। আর গরু বিক্রির টাকা আমরা সঞ্চয় করি বা বড় কোনো পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যয় করি। খোলা আকাশে পলিথিন দিয়ে তাবু টানিয়ে আমরা পালা করে রাত জেগে গরু পাহারা দেই।’
পেশার সংকট ও চ্যালেঞ্জ
তবে এই পেশায় কিছু সংকটও রয়েছে। বর্ষাকালে টানা বৃষ্টি বা বন্যার সময় মাঠে পানি জমে গেলে গরুর খাবারের তীব্র সংকট দেখা দেয়। তখন খড় বা দানাদার খাবার কিনে খাওয়াতে হয়, যা বেশ ব্যয়বহুল। তানোরের স্থানীয়রা জানান, আগে এই অঞ্চলে গৃহস্থরা এভাবে বিশাল গরুর পাল পালন করত। কিন্তু এখন আধুনিক কৃষির প্রভাবে স্থানীয়ভাবে এমন বড় পালের দেখা মেলে না বললেই চলে।
সংশ্লিষ্টদের মতামত
প্রতি বছর এই সময়ে মূলত চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকা থেকেই এই ভ্রাম্যমাণ খামারিরা তানোরের মাঠগুলোতে গরু নিয়ে আসেন। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সহযোগিতা পেলে দেশি জাতের গরু পালনের এই পদ্ধতি আমিষের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই ঐতিহ্যবাহী পেশাটি সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে শক্তিশালী করা সম্ভব বলে তারা মত প্রকাশ করেছেন।



