জ্বালানি সংকটে সমুদ্রে মাছ আহরণে ব্যাপক পতন
দেশের সমুদ্র অঞ্চলে জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাবে মাছ আহরণে উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা দিয়েছে। সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সাগর থেকে মাছ ধরা প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমেছে। এই সংকটের ফলে উপকূলীয় জেলেদের পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোরও নিয়মিত মাছ শিকারে যাওয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মাছ আহরণের পরিসংখ্যানে নেতিবাচক প্রবণতা
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. জহিরুল হক জানান, ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে মাছ আহরণের চূড়ান্ত তথ্য এখনো প্রস্তুত না হলেও, এই দুই মাসে আহরণ স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে। দেশে প্রায় ৩০ হাজার নৌযান ও বাণিজ্যিক জাহাজ সাগরে মাছ ধরে, যেগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে ১০ হাজার টন মাছ ও চিংড়ি আহরণ করা হয়। তবে জ্বালানিসংকটে অনেক জাহাজ ও নৌযান নিয়মিত সাগরে যেতে পারছে না, এবং যেসব নৌযান সাগরে যাচ্ছে, তাদেরও অবস্থানের সময় কমেছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব ও জেলেদের অবস্থা
জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলার উপকূলীয় জেলেরা নিয়মিত মাছ শিকারে সাগরে যেতে পারছেন না। কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের মতে, চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় জেলার অন্তত ৪ হাজার ট্রলারে মাছ আহরণ বন্ধ রয়েছে। যে পরিমাণ জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে উপকূল থেকে সাগরের ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের বেশি দূরে পৌঁছানো যায় না, অথচ মাছ ধরতে হলে ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে যেতে হয়।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য দপ্তর জানায়, জেলায় ৫ থেকে ৬ হাজার নৌযান এখন সাগরে যেতে পারছে না। এসব নৌযানে দৈনিক ১২০ থেকে ১৫০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হলেও, তারা মাত্র ২৫ থেকে ৩০ লিটার জ্বালানি পাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি জেলেদের জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে, এবং মৌসুমের শেষ সময়েও তাদের মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে।
বাণিজ্যিক জাহাজের উপর সংকটের প্রভাব
দেশের সমুদ্র এলাকায় ২৬৮টি বাণিজ্যিক জাহাজ মৎস্য শিকার করে, যার মধ্যে চিংড়ি শিকারের জাহাজ ৩৫টি। এসব জাহাজে দৈনিক গড়ে অন্তত ৩ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়, কিন্তু জ্বালানিসংকটের কারণে ফিশিং ট্রিপ ২৪ দিন থেকে কমিয়ে ১৮-২০ দিনে নামিয়ে আনতে হচ্ছে। বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনাম চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় কম জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে, যা মোট আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের উপপরিচালক শওকত কবির চৌধুরী জানান, এই সমস্যা সম্পর্কে তারা অবগত এবং অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে লিখিতভাবে জানাতে বলেছেন। মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়েছে এবং বিষয়টি আমলে নেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ ও নিষেধাজ্ঞা
এই সংকটের মধ্যে ১৫ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরার উপর টানা ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে, যা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই আহরণের লক্ষ্যে আরোপিত হয়েছে। জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি জেলি ফিশের আধিক্য, সাগর উত্তালসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাবও মাছ আহরণ কমাতে ভূমিকা রাখছে। সামগ্রিকভাবে, এই পরিস্থিতি দেশের মৎস্য খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে, যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



