জ্বালানি সংকটে পাথরঘাটার জেলেদের শেষ আশা ভেঙে পড়ল
আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে গভীর বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ওপর সরকারের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শুরু হতে যাচ্ছে। এই নিষেধাজ্ঞার আগে শেষবারের মতো সাগরে গিয়ে কিছু মাছ ধরে সংসারের খরচ জোগানোর আশায় ছিলেন পাথরঘাটার জেলেরা। কিন্তু তীব্র জ্বালানি তেলের সংকটে সেই আশাও ভেঙে পড়েছে। ট্রলার প্রস্তুত থাকলেও সাগরে যেতে পারছেন না অধিকাংশ জেলে।
ঘাটে সারি সারি ট্রলার, তেলের অভাবে অচল
পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্যবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি ট্রলার নোঙর করে আছে ঘাটে। অনেক জেলে ট্রলার প্রস্তুত করেও তেলের অভাবে সাগরে যেতে পারছেন না। কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না। স্থানীয় জেলে মো. বশির মিয়া বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার আগে এই সময়টা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই ট্রিপে যা আয় হয়, তা দিয়েই দুই মাস সংসার চালাতে হয়। কিন্তু তেল না থাকায় সাগরে যেতে পারছি না। পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলব বুঝতে পারছি না।’
ধারদেনা করে ট্রলার প্রস্তুত, কিন্তু তেলের অনিশ্চয়তা
আরেক জেলে আব্দুল কাদের জানান, ‘আমরা ধারদেনা করে ট্রলার প্রস্তুত করেছি। আশা ছিল শেষ ট্রিপে কিছু মাছ ধরে ঋণ শোধ করব। কিন্তু তেলের জন্য এখন সবকিছু অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’ ট্রলার মালিক মো. সোহেল রানা বলেন, ‘একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে ১০ থেকে ২০ ব্যারেল জ্বালানি তেল প্রয়োজন। বাজারে তেলের সংকট থাকায় চাইলেও ট্রলার পাঠানো যাচ্ছে না। এতে আমাদের বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।’
অসাধু ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, পাথরঘাটা শহরের কিছু অসাধু তেল ব্যবসায়ী তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। এরপর তারা প্রতি ব্যারেলে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেশি আদায় করছে। তিনি আরও বলেন, ‘সাগরেও মাছ কম, আবার বেশি দামে তেল কিনে কোনোভাবেই জেলেরা পোষাতে পারবেন না। তাই অসহায় জেলেরা ঘাটে বসেই অলস সময় পার করছেন।’
পুরো এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা
পাথরঘাটার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই সংকট শুধু জেলেদের নয়, এর প্রভাব পড়বে পুরো এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বাজারে মাছের সরবরাহ কমে যাবে এবং অনেকেই কাজ হারাবেন। স্থানীয় সমাজকর্মী মির্জা শহিদুল ইসলাম খালেদ বলেন, নিষেধাজ্ঞা সামনে রেখে যখন জেলেদের শেষ ভরসা ছিল সাগরে যাওয়া, ঠিক তখনই জ্বালানিসংকট তাদের সেই পথ বন্ধ করে দিয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান না হলে পাথরঘাটার শত শত ট্রলার মালিক হাজারো জেলে পরিবার মানবিক সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয়তা
উল্লেখ্য, প্রতি বছর প্রজনন মৌসুমে সামুদ্রিক মাছের বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাগরে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তবে নিষেধাজ্ঞার আগে জ্বালানিসংকটের কারণে জেলেরা সাগরে যেতে না পারায় তাদের আর্থিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয় নেতা ও জেলেরা।



