গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন আবিষ্কার: স্বল্পমেয়াদী ও উচ্চফলনশীল ‘গাউ ধান ৪’
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ‘গাউ ধান ৪’ আবিষ্কার

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন মাইলফলক: ‘গাউ ধান ৪’ উদ্ভাবন

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাউ) দেশের কৃষি গবেষণায় একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ‘গাউ ধান ৪’ নামে একটি স্বল্পমেয়াদী ও উচ্চফলনশীল আউশ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে, যা কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। প্রায় এক দশকের নিরলস গবেষণার পর এই জাতটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন পেয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা ৯৫-এ নিয়ে গেছে।

দীর্ঘ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া

কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এম ময়নুল হক ও মো. মোশিউল ইসলামের নেতৃত্বে গবেষক দল এই জাতটি উদ্ভাবন করেছেন। গবেষণা প্রক্রিয়ায় পাড়িজা আউশ ধানের সাথে বিইউ ধান ২-এর সংকরায়ন করা হয়, যার ফলস্বরূপ জিএইউ-৯৯৭৪-৫২-৭-২ নামক একটি প্রতিশ্রুতিশীল লাইন তৈরি হয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ বীজ প্রত্যায়ন সংস্থার তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযোজন ও বহু-অবস্থান পরীক্ষার মাধ্যমে এই লাইনের কার্যকারিতা যাচাই করা হয়।

২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গাউ ধান ৪’ হিসেবে এই জাতটি অনুমোদিত হয়। এই অনুমোদন কৃষি গবেষণায় প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতিরই স্বাক্ষর বহন করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘গাউ ধান ৪’-এর বৈশিষ্ট্য ও সুবিধাসমূহ

এই নতুন আউশ ধানের জাতটি তার স্বল্প পরিপক্বতা সময় ও উচ্চ উৎপাদন ক্ষমতার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাধারণত আউশ ধানের ফলন আমন ও বোরো মৌসুমের তুলনায় কম হয়, কিন্তু ‘গাউ ধান ৪’ এই ধারণা পাল্টে দিয়েছে। জাতটির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • স্বল্প পরিপক্বতা সময়: বপন করার মাত্র ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে ফসল কাটা যায়, যা কৃষকদের দ্রুত ফসল ঘরে তোলার সুযোগ দেয়।
  • উচ্চ ফলন ক্ষমতা: অনুকূল পরিবেশে প্রতি হেক্টরে প্রায় ৫ থেকে ৫.৫ টন ফলন দেয়, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় ১০-১৫% বেশি।
  • পুষ্টিগুণ: ধানটিতে প্রায় ২৪.৫৮% অ্যামাইলোজ ও ৮.৩৮% প্রোটিন রয়েছে, যা কার্বোহাইড্রেট পরিপাক ও মানবদেহের বৃদ্ধিতে সহায়ক।
  • কম পানি প্রয়োজন: স্বল্প পানি ব্যবহারে চাষযোগ্য, যা দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে আউশ চাষের জন্য উপযোগী করে তুলেছে।
  • রোগ সহনশীলতা: সাধারণ রোগের প্রতি উন্নত সহনশীলতা প্রদর্শন করে, যা ফসলের ক্ষতি রোধে সহায়ক।

এছাড়াও, ধানটির দানাগুলো লম্বা ও সরু, যা বাজারে উচ্চমানের হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতি হেক্টরে মাত্র ২৫-৩০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়, যা চাষের খরচ কমিয়ে আনে। বেলে দোআঁশ থেকে এটেল দোআঁশ মাটিতে জাতটি সর্বোত্তম ফলন দেয়।

কৃষক ও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভাব

‘গাউ ধান ৪’ বিশেষভাবে মঙ্গাপ্রবণ উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের উপকারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর স্বল্প পরিপক্বতা সময় কৃষকদের একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল চাষের সুযোগ সৃষ্টি করবে, যা আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।

গবেষক মো. মোশিউল ইসলাম বলেন, “বাজারে পছন্দনীয় সুগঠিত দানাসহ একটি স্বল্পমেয়াদী ও উচ্চফলনশীল আউশ ধানের জাত তৈরি করাই আমাদের লক্ষ্য ছিল। আমরা আশা করি, এটি কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিকেএম মুস্তাফিজুর রহমান গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “এই উদ্ভাবন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের নিষ্ঠা ও দক্ষতার প্রতিফলন। নতুন এই জাত কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে এবং বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।”

চাষের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বীজতলায় বপন করার পর ২০-২২ দিনের মধ্যে চারা রোপণ করতে হবে, যেখানে সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার ও গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার রাখা উচিত।

এই উদ্ভাবন কৃষি গবেষণায় বাংলাদেশের অগ্রগতির又一个 উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি উন্নয়নে নতুন পথ দেখাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।